বরুণ চক্রবর্তীর ঘূর্ণিতে কেকেআরের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন: আইপিএলে নতুন আশা
ঘুরে দাঁড়ালো কেকেআর: বরুণ ও নারিনের স্পিন জাদুতে মজেছে ক্রিকেট বিশ্ব
আইপিএল ২০২৬-এর শুরুতে টানা পাঁচ ম্যাচ হেরে কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) প্লে-অফের স্বপ্ন যখন ফিকে হয়ে আসছিল, তখনই যেন রূপকথার মতো ফিরে এল দলটি। রোববার হায়দ্রাবাদের মাঠে সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের বিপক্ষে কেকেআরের জয় শুধুমাত্র একটি জয় নয়, বরং এটি তাদের সামগ্রিক ঘুরে দাঁড়ানোর এক বড় বার্তা। আর এই পুনর্জাগরণের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন দুই স্পিন জাদুকর—সুনীল নারিন এবং বরুণ চক্রবর্তী।
নারিন-বরুণের বোলিং তোপ
ম্যাচে সুনীল নারিন ৪ ওভারে ৩১ রান দিয়ে ২ উইকেট তুলে নেন। অন্যদিকে, বরুণ চক্রবর্তী ৪ ওভারে ৩৬ রান দিয়ে ৩ উইকেট শিকার করেন। এই দুই অভিজ্ঞ স্পিনারের সম্মিলিত ৮ ওভারের স্পেল ছিল সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের ব্যাটিং লাইনআপের জন্য এক চরম অস্বস্তির কারণ। পরিসংখ্যান বলছে, তাদের এই নিয়ন্ত্রিত বোলিংই ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। নারিন বরাবরের মতোই কিপটে বোলিং করে প্রতিপক্ষের রান তোলার গতি কমিয়ে দিয়েছিলেন। পাওয়ারপ্লেতে ২০ রান দেওয়ার পর নিজের শেষ দুই ওভারে তিনি মাত্র ১১ রান খরচ করেন, যা হায়দ্রাবাদের ব্যাটারদের গলায় ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বরুণ চক্রবর্তীর কৌশল পরিবর্তন
বরুণ চক্রবর্তীর আজকের এই সাফল্যের পেছনে ছিল দারুণ এক কৌশলগত পরিবর্তন। ইনিংসের শুরুতে ট্র্যাভিস হেডের হাতে মার খাওয়ার পর বরুণ নিজের বোলিংয়ের গতি কমিয়ে আনেন। ইএসপিএনক্রিকইনফোর ‘টাইমআউট’ শো-তে আম্বাতি রাইডু বরুণের এই বিবর্তনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। রাইডু বলেন, ‘বরুণ শুরুতে কিছুটা দ্রুতগতিতে বোলিং করছিল। কিন্তু আঘাত পাওয়ার পর সে নিজের গতি কমিয়ে আনে এবং ক্রিসের সঠিক ব্যবহার করতে শুরু করে। বিশেষ করে স্লো ডেলিভারিগুলো পিচের চরিত্র অনুযায়ী খেলা ব্যাটারদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল।’
মরসুমের শুরুতে বরুণ চোটের কারণে ছন্দ হারিয়ে ফেলেছিলেন। প্রথম দুই ম্যাচে তার উইকেট ছিল শূন্য এবং রান খরচ করেছিলেন অনেক। কিন্তু বিরতির পর ফিরে এসে গত চার ম্যাচে তিনি ১০ উইকেট নিয়েছেন। এই ধারাবাহিকতা কেকেআরকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
ডেনিয়েল ভেট্টোরির বিশ্লেষণ
সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের কোচ ডেনিয়েল ভেট্টোরি ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে কেকেআর স্পিনারদের প্রশংসা করেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে, তাদের ব্যাটাররা কেকেআরের স্পিন জাল ভেদ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ভেট্টোরি বলেন, ‘আমি মনে করি কেকেআর তাদের স্পিনারদের জন্য সঠিক লেন্থ খুঁজে পেয়েছে। বরুণ চক্রবর্তী চাপের মুখেও উইকেট তুলে নিতে সক্ষম হয়েছে, যা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সবচেয়ে মূল্যবান কারেন্সি। উইকেট পড়ার ধরন আমাদের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।’
প্লে-অফের লড়াইয়ে কেকেআর
মরসুমের শুরুতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফর্ম নিয়ে চিন্তিত ছিলেন বরুণ চক্রবর্তী। তখন তার বোলিংয়ে যে তাড়াহুড়ো ছিল, তা এখন পুরোপুরি উধাও। পীযূষ চাওলা এবং আম্বাতি রাইডু যেমনটা বলেছিলেন, সেই ‘জাদুর ডেলিভারি’র পেছনে না ছুটে বরুণ এখন নিজের শক্তির জায়গায় ফিরে এসেছেন। তিনি এখন বলের রেভস (ঘূর্ণি) নিয়ে কাজ করছেন এবং সঠিক জায়গায় বল ফেলছেন।
যদিও আইপিএল ২০২৬-এর পয়েন্ট টেবিলে কেকেআরের অবস্থান এখনো বেশ চ্যালেঞ্জিং, তবে বরুণ ও নারিন যদি এভাবে দাপট ধরে রাখতে পারেন, তবে শেষ মুহূর্তে প্লে-অফের টিকিট পাওয়ার দৌড়ে নাইট রাইডার্সকে অবজ্ঞা করার উপায় নেই। এখন দেখার বিষয়, আগামী ম্যাচগুলোতে এই জয়ের ধারা বজায় রেখে কেকেআর নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে কি না।
- নারিন ও বরুণের মোট উইকেট: ৫টি
- গত চার ম্যাচে বরুণের উইকেট: ১০টি
- দলীয় পারফরম্যান্স: টানা তিন জয়
ক্রিকেট প্রেমীদের জন্য কেকেআরের এই ঘুরে দাঁড়ানো নিঃসন্দেহে টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণ। হায়দ্রাবাদের কঠিন কন্ডিশনে স্পিনারদের এমন দুর্দান্ত ব্যবহার প্রমাণ করে যে, সঠিক পরিকল্পনা এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে যেকোনো পরিস্থিতি থেকে জয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব।
