সোফিয়া গার্ডেন্সে ইতিহাসের সাক্ষী: টম নর্টনের রাজকীয় অভিষেক
কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের আঙিনায় মাঝে মাঝে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যা ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে যায়। সোফিয়া গার্ডেন্সে গ্ল্যামারগন এবং সমারসেটের মধ্যকার ম্যাচে ঠিক তেমনই এক রোমাঞ্চকর দৃশ্যের অবতারণা ঘটালেন ১৮ বছর বয়সী তরুণ তুর্কি টম নর্টন। অ্যাবারগাভেনি থেকে উঠে আসা এই তরুণ পেসার নিজের প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেকেই হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি সর্বকনিষ্ঠ অভিষেককারী হিসেবে হ্যাটট্রিক করার বিশ্বরেকর্ড নিজের করে নিলেন।
রেকর্ডবুক ওলটপালট করা সেই জাদুকরী ওভার
ম্যাচের দ্বিতীয় দিনের শেষ এক ঘণ্টা ছিল সমারসেটের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। সমারসেটের দ্বিতীয় ইনিংসে টম নর্টনের বিধ্বংসী বোলিংয়ের মুখে পড়ে মাত্র ৩২ রানেই ৬ উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ে পড়ে সফরকারীরা। নর্টন তার স্পেলে মাত্র ২২ রান খরচ করে তুলে নেন ৪টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট।
নর্টনের এই অবিশ্বাস্য যাত্রার শুরু হয় জেমস রিউকে ফেরানোর মাধ্যমে। রিউ ১৩ বল খেলে কোনো রান করার আগেই নর্টনের শিকার হন। এরপরই শুরু হয় সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। নর্টন একে একে টম ল্যামনবিকে আউট করে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন এবং পরের বলেই তরুণ আর্চি ভনকে এলবিডব্লিউর ফাঁদে ফেলেন। এর মাধ্যমে ১৯০৬ সালের পর প্রথম বোলার হিসেবে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের অভিষেকে হ্যাটট্রিক করার কৃতিত্ব দেখালেন তিনি। গ্ল্যামারগনের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ বোলার হিসেবে হ্যাটট্রিক করার রেকর্ডটিও এখন তার দখলে।
সমারসেটের আধিপত্য ও প্রথম ইনিংসের লড়াই
দিনের শুরুতে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই সমারসেটের হাতে ছিল। প্রথম ইনিংসে তারা ৩৫৪ রান সংগ্রহ করে। সমারসেটের পক্ষে টম আবেল ৮৬ এবং থমাস ৭১ রানের লড়াকু ইনিংস খেলেন। গ্ল্যামারগনের হয়ে প্রথম ইনিংসে নর্টন ৭৫ রানে ৩ উইকেট শিকার করেছিলেন।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে গ্ল্যামারগন তাদের প্রথম ইনিংসে ২২৯ রানে অলআউট হয়ে যায়। এতে করে সমারসেট ১২৫ রানের লিড পায়। গ্ল্যামারগনের ইনিংসে বেন কেলওয়ে ৫৯ রান করে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। মিগেল প্রিটোরিয়াস ৫০ রানে ৩ উইকেট নিয়ে গ্ল্যামারগনের টপ অর্ডার ধসিয়ে দেন। তবে শেষ দিকে কেলওয়ে এবং ক্রিস কুকের ৮০ রানের জুটিটি ছিল গ্ল্যামারগনের জন্য একমাত্র স্বস্তির জায়গা।
সিম কন্ডিশন এবং ব্যাটারদের কঠিন পরীক্ষা
সোফিয়া গার্ডেনসের উইকেটে বল যথেষ্ট মুভমেন্ট পাচ্ছিল, বিশেষ করে গুড লেন্থে বল পিচ করলে ব্যাটারদের জন্য তা খেলা ছিল অত্যন্ত কঠিন। গ্ল্যামারগনের ব্যাটাররা যখন লড়াই করছিলেন, তখন দেখা গেছে লেন্থ বল খেলতে গিয়েই তারা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন। কেলওয়ে অবশ্য দারুণ দক্ষতায় ড্রাইভের মাধ্যমে রান সংগ্রহ করে দলের স্কোরবোর্ডকে এগিয়ে নিয়ে যান।
প্রিটোরিয়াস যখন কার্লসন এবং কলিন ইনগ্রামকে পরপর দুই বলে আউট করেন, তখন গ্ল্যামারগন ৫৯ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল। সেই সংকটময় মুহূর্তে টিম ফন ডের গুগটেন লোয়ার অর্ডারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ রান যোগ করে দলকে ফলো-অন থেকে রক্ষা করেন। এর ফলেই গ্ল্যামারগন দ্বিতীয় ইনিংসে সমারসেটের ওপর আক্রমণ করার সুযোগ পায়।
নর্টনের সমর্থনে রায়ান হ্যাডলির জ্বলে ওঠা
দিনের শেষ বেলায় যখন সমারসেট দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে, তখন পুরো আলো কেড়ে নেন নর্টন। তবে তাকে যোগ্য সংগত দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান পেসার রায়ান হ্যাডলি। নর্টন যখন একের পর এক উইকেট নিয়ে সমারসেটকে কোণঠাসা করছিলেন, হ্যাডলি অন্য প্রান্ত থেকে চাপ বজায় রেখে আরও দুটি উইকেট তুলে নেন। জাইন-উল-হাসানও নতুন বলে দারুণ কৃপণ বোলিং করে চাপ সৃষ্টি করেন।
ম্যাচের বর্তমান অবস্থা ও চূড়ান্ত উত্তেজনা
দ্বিতীয় দিন শেষে সমারসেট তাদের দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট হারিয়ে মাত্র ৩২ রান তুলেছে। সব মিলিয়ে তারা এখন ১৫৭ রানে এগিয়ে আছে। হাতে মাত্র ৪ উইকেট অবশিষ্ট থাকায় ম্যাচের পাল্লা এখন যেকোনো দিকেই হেলতে পারে। তবে ক্রিকেটের নবীন নক্ষত্র টম নর্টন যে রূপকথা সোফিয়া গার্ডেন্সে লিখেছেন, তা ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে দীর্ঘকাল গেঁথে থাকবে।
অভিষেক ম্যাচেই এমন পারফরম্যান্স প্রমাণ করে যে, ওয়েলশ ক্রিকেটে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, তৃতীয় দিনে গ্ল্যামারগনের বোলাররা সমারসেটকে কত দ্রুত অলআউট করে জয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিজেদের নাগালে রাখতে পারেন।
0 Comments