[CRK] কানাডা ক্রিকেটে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ: তদন্তে নেমেছে আইসিসি
[CRK]
কানাডা ক্রিকেটে দুর্নীতির কালো ছায়া: তদন্তে আইসিসি
ক্রিকেট বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যখন খেলাটি তার জনপ্রিয়তার শিখরে, ঠিক তখনই কানাডা ক্রিকেট বোর্ডের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো দুর্নীতির এক ভয়াবহ চিত্র। আইসিসি-র অ্যান্টি-করাপশন ইউনিট (ACU) বর্তমানে ক্রিকেট কানাডাকে কেন্দ্র করে দুটি পৃথক তদন্ত চালাচ্ছে। এর মধ্যে একটি তদন্ত অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ এটি সরাসরি সাম্প্রতিক পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের একটি ম্যাচের সাথে জড়িত।
এই পুরো বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে কানাডার পাবলিক ব্রডকাস্টার সিবিসি (CBC)-র একটি অনুসন্ধানমূলক ডকুমেন্টারি ‘করাপশন, ক্রাইম অ্যান্ড ক্রিকেট’-এর মাধ্যমে। the fifth estate দ্বারা প্রযোজিত এই ৪৩ মিনিটের ফিল্মটিতে কানাডা ক্রিকেটের শাসন ব্যবস্থা এবং দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ আনা হয়েছে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেই রহস্যময় ওভার
ডকুমেন্টারিটিতে দাবি করা হয়েছে যে, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে কানাডার ম্যাচটিতে দুর্নীতির প্রমাণ থাকতে পারে। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং ইনিংসের পঞ্চম ওভারটি এখন আইসিসি-র গোয়েন্দাদের আতসকাঁচের নিচে। এই ওভারটি বল করেছিলেন কানাডার তৎকালীন অধিনায়ক দিলপ্রীত বাজওয়া।
বাজওয়ার ভূমিকাটি বেশ রহস্যজনক। টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার মাত্র তিন সপ্তাহ আগে তাকে অধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। মূলত একজন ব্যাটিং অলরাউন্ডার এবং অফ-স্পিনার বাজওয়া যখন বল হাতে নেন, তখন নিউজিল্যান্ডের স্কোর ছিল ২ উইকেটে ৩৫ রান।
ম্যাচের শুরুটা কানাডা করেছিল গতি bowlers জাসকারন সিং এবং ডিলন হেইলিগারের মাধ্যমে, যারা যথাক্রমে ১৫ এবং ১৪ রান দিয়ে বেশ দুর্বল সূচনা করেন। এরপর তৃতীয় ওভারে সাদ বিন জাফর এসে একটি উইকেট মেইডেন ওভার দিয়ে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। চতুর্থ ওভারে হেইলিগার একটি উইকেট নিলেও পঞ্চম ওভারে বাজওয়ার বোলিং ছিল চরম হতাশাজনক। তিনি একটি নো-বল এবং একটি লেগ-সাইড ওয়াইড দিয়ে শুরু করেন এবং পুরো ওভারে মোট ১৫ রান খরচ করেন। এই অস্বাভাবিক বোলিং পারফরম্যান্সটিই এখন তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
কোচদের অভিযোগ এবং সিলেকশনে প্রভাব
তদন্তের দ্বিতীয় অংশটি কানাডার অভ্যন্তরীণ শাসন এবং দল নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। কানাডার প্রাক্তন কোচ খুররাম চোহান-এর একটি লিক হওয়া ফোন রেকর্ডিং আইসিসি-র হাতে পৌঁছেছে। ওই অডিওতে চোহান দাবি করেছেন যে, ক্রিকেট কানাডার তৎকালীন সিনিয়র বোর্ড সদস্যরা তাকে নির্দিষ্ট কিছু খেলোয়াড়কে জাতীয় দলে নেওয়ার জন্য প্রবল চাপ দিয়েছিলেন।
রেকর্ডিংটিতে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের প্রচেষ্টার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও আইসিসি-র মতে এর পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া এখনও চ্যালেঞ্জিং। একইভাবে, ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রাক্তন কোচ পুবুদু দসনায়েকে-ও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, বোর্ড তাকে নির্দিষ্ট খেলোয়াড়দের দলে নিতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিল এবং তিনি যখন তা মানতে অস্বীকার করেন, তখন তাকে হুমকি দেওয়া হয় যে তার চুক্তি বাতিল করা হবে। বর্তমানে দসনায়েকে তাকে অন্যায়ভাবে বরখাস্ত করার অভিযোগে ক্রিকেট কানাডার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও আর্থিক সংকট
গত এক বছরে ক্রিকেট কানাডা চরম প্রশাসনিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। প্রাক্তন সিইও সালমান খানের নিয়োগ এবং দ্রুত অপসারণ এর বড় উদাহরণ। আইসিসি লক্ষ্য করে যে, সালমান খান তার নিয়োগের সময় পূর্বের অপরাধমূলক অভিযোগগুলো গোপন করেছিলেন। পরবর্তীতে ক্যালগারি পুলিশ তাকে চুরি এবং জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত করে। যদিও খান এই দাবি অস্বীকার করেছেন। সম্প্রতি আমজাদ বাজওয়ার পরিবর্তে আরভিন্দার খোসা বোর্ড প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।
খেলোয়াড়দের অবস্থাও ছিল শোচনীয়। ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পুরস্কারের টাকা পেতে বিলম্ব হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ডকুমেন্টারিতে দাবি করা হয়েছে যে, জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত কোনো স্থায়ী চুক্তি ছিল না এবং বিশ্বকাপের আগে মাত্র চার মাসের জন্য তাদের সামান্য রিটেইনার ফি দেওয়া হয়েছিল।
আইসিসি-র অবস্থান এবং অপরাধ জগতের যোগসূত্র
আইসিসি-র ইন্টিগ্রিটি ইউনিটের অন্তর্বর্তী জেনারেল ম্যানেজার অ্যান্ড্রু এফগ্রেভ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তারা সিবিসি-র ডকুমেন্টারিটি সম্পর্কে অবগত। তবে আইসিসি-র প্রতিষ্ঠিত নিয়ম অনুযায়ী, তদন্ত চলাকালীন তারা নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য করতে পারছেন না।
সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগটি এসেছে একজন প্রাক্তন খেলোয়াড়ের কাছ থেকে, যিনি দাবি করেছেন যে তাকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল এবং এর পেছনে সংগঠিত অপরাধী চক্রের (Organized Crime) হাত রয়েছে। তবে অ্যান্ড্রু এফগ্রেভ স্পষ্ট করেছেন যে, এই বিষয়টি আইসিসি-র অ্যান্টি-করাপশন ইউনিটের আওতার বাইরে এবং এটি সম্পূর্ণভাবে স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব।
ক্রিকেট কানাডার এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এক অন্ধকার দিক উন্মোচিত করেছে। এখন দেখার বিষয়, আইসিসি-র এই তদন্তে কারা দোষী সাব্যস্ত হয় এবং কানাডা ক্রিকেট বোর্ড কীভাবে এই সংকট কাটিয়ে ওঠে।
