আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি ও মালিকদের প্রতি বিসিসিআই-এর কড়া হুঁশিয়ারি: শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে বড় শাস্তির সংকেত
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল)-এর বর্তমান মৌসুমে খেলোয়াড়, সাপোর্ট স্টাফ এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের আচরণ ও শৃঙ্খলা নিয়ে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (বিসিসিআই)। সম্প্রতি একটি বিরল পদক্ষেপে বোর্ড ১০টি ফ্র্যাঞ্চাইজিকেই একটি সাত পাতার দীর্ঘ নির্দেশিকা পাঠিয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, প্রোটোকল এবং শৃঙ্খলার এই ধরনের লঙ্ঘন টুর্নামেন্টের ভাবমূর্তি নষ্ট করার পাশাপাশি বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট দলের জন্য বড় ধরনের বিপত্তি ডেকে আনতে পারে। বিসিসিআই সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া স্বাক্ষরিত এই নির্দেশিকায় কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের নাম উল্লেখ না করা হলেও, মৌসুমে ঘটে যাওয়া একাধিক অপ্রীতিকর ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
বিসিসিআই-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বর্তমান আইপিএল মৌসুমে খেলোয়াড় এবং কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা বোর্ডের নজরে এসেছে। দেবজিৎ সাইকিয়া সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘যদি এই বিষয়গুলোর এখনই সমাধান না করা হয়, তবে তা টুর্নামেন্টের গরিমা ও ফ্র্যাঞ্চাইজির সম্মানের অপূরণীয় ক্ষতি করতে পারে। এমনকি এটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনি জটিলতা এবং গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখেও ফেলতে পারে।’
হোটেলের ঘরে অননুমোদিত প্রবেশ: ‘হানি-ট্র্যাপিং’ ও দুর্নীতির ঝুঁকি
বিসিসিআই-এর এই নির্দেশিকায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে খেলোয়াড়দের হোটেলের ঘরে অননুমোদিত ব্যক্তিদের প্রবেশের ওপর। বোর্ডের কাছে এমন অনেক অভিযোগ এসেছে যেখানে দেখা গেছে, খেলোয়াড় এবং সাপোর্ট স্টাফরা টিম ম্যানেজারের অনুমতি ছাড়াই বাইরের লোকজনকে তাদের রুমে আসার সুযোগ করে দিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী, যে কোনো অতিথিকে রুমে ডাকার আগে টিম ম্যানেজারের অনুমতি নিতে হয় এবং অ্যান্টি-করাপশন ইউনিট (ACU)-কে তা জানাতে হয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, টিম ম্যানেজাররা এই ধরনের অতিথিদের সম্পর্কে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন।
বোর্ড স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, এখন থেকে হোটেলের রুমে পরিবারের সদস্য বা বন্ধু—যে কেউ প্রবেশ করতে চাইলে টিম ম্যানেজারের লিখিত অনুমতি বাধ্যতামূলক। অন্যথায় অতিথিদের শুধুমাত্র হোটেলের লবিতে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হবে। বিসিসিআই মনে করিয়ে দিয়েছে যে, বড় স্পোর্টিং ইভেন্টগুলোতে ‘হানি-ট্র্যাপিং’ বা পরিকল্পিতভাবে খেলোয়াড়দের ফাঁদে ফেলার ঝুঁকি সবসময় থাকে। দুর্নীতির হাত থেকে টুর্নামেন্টকে রক্ষা করতে এই ধরনের কঠোর প্রোটোকল মেনে চলা অপরিহার্য। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে যে, যৌন হেনস্থার মতো গুরুতর আইনি অভিযোগের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তাই ফ্র্যাঞ্চাইজি ম্যানেজমেন্টকে সব সময় সতর্ক থাকতে হবে।
ম্যাচ চলাকালীন মালিকদের হস্তক্ষেপ: প্রোটোকল লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ
মাঠে ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের আচরণ নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিসিসিআই। দেখা গেছে, কিছু মালিক লাইভ ম্যাচ চলাকালীন ডাগআউট বা সীমাবদ্ধ এলাকায় গিয়ে খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলছেন, এমনকি তাদের জড়িয়ে ধরছেন। বিসিসিআই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ম্যাচ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মালিকদের খেলোয়াড় বা দলের সদস্যদের সঙ্গে মেলামেশা করার কোনো অনুমতি নেই।
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ‘মালিকদের এই ধরনের আচরণ যত ভালো উদ্দেশ্যেই হোক না কেন, তা প্রতিষ্ঠিত প্রোটোকলের পরিপন্থী এবং দলের ডিনামিক্স ও ম্যাচের স্বাভাবিক গতিতে হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য হতে পারে।’ মালিক বা তাদের সহযোগীরা যদি ডাগআউট, ড্রেসিংরুম বা প্লেয়িং এরিয়া (PMOA)-তে অননুমোদিতভাবে প্রবেশ করেন, তবে তাকে ‘গুরুতর নিয়ম লঙ্ঘন’ হিসেবে দেখা হবে।
ভ্যাপিং ও ই-সিগারেটের ব্যবহার নিষিদ্ধ
আরেকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে এই নির্দেশিকায়। স্টেডিয়ামের ড্রেসিংরুম বা ডাগআউটে ভ্যাপিং এবং নিষিদ্ধ পদার্থের ব্যবহার নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে বোর্ড। উল্লেখ্য যে, গত মাসে পাঞ্জাব কিংসের বিপক্ষে ম্যাচের সময় রাজস্থান রয়্যালস অধিনায়ক রিয়ান পরাগ ড্রেসিংরুমে ভ্যাপিং করার অপরাধ স্বীকার করেছিলেন এবং তাকে শাস্তিও পেতে হয়েছিল। ভারতে ই-সিগারেট ও ভ্যাপিং নিষিদ্ধ হওয়ায়, বিসিসিআই জানিয়েছে যে এটি কেবল আইপিএল প্রোটোকল লঙ্ঘন নয়, বরং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। ভেন্যু, ড্রেসিংরুম, ডাগআউট, হোটেল এবং ট্রেনিং এরিয়ায় এই ধরনের সামগ্রী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
শাস্তি ও কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি
বিসিসিআই জানিয়ে দিয়েছে যে, নির্দেশিকাগুলো যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করতে আকস্মিক তল্লাশি বা র্যান্ডম চেক চালানো হবে। কোনো দল বা ব্যক্তি যদি এই নির্দেশ অমান্য করে, তবে তাদের শো-কজ নোটিশ প্রদান, বড় অঙ্কের জরিমানা, এমনকি চলমান বা পরবর্তী মৌসুম থেকে বহিষ্কারের মতো কঠোর শাস্তি দেওয়া হতে পারে। বিসিসিআই-এর মতে, এই কড়াকড়ি কাউকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নয়, বরং টুর্নামেন্টের সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি অংশীদারকে সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং ভাবমূর্তির সংকট থেকে রক্ষা করার জন্য।
0 Comments