আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের মুখোমুখি হতে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স এবার উড়ে এসেছে চেন্নাইয়ে, তাদের দ্বিতীয় লড়াইয়ের জন্য। ওয়াংখেড়েতে আগের ম্যাচের লজ্জাজনক পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে মরিয়া তারা, যেখানে তারা ১০৩ রানের বিশাল ব্যবধানে হেরে দলের মনোবল ভেঙে গিয়েছিল। এই ম্যাচটি তাদের জন্য কেবল দুটি পয়েন্ট অর্জনের সুযোগ নয়, বরং হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ারও একটি প্ল্যাটফর্ম। তাই চিপকের এই হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে মুম্বাইয়ের ক্রিকেটাররা নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে প্রস্তুত ছিল।
পাওয়ারপ্লেতে চেন্নাইয়ের দাপট ও মুম্বাইয়ের প্রতিরোধ
চেপকের মাঠে চেন্নাই সুপার কিংস মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের বিরুদ্ধে পাওয়ারপ্লেতে এক দুর্দান্ত শুরু করেছিল। শুরুতেই তারা উইল জ্যাকসকে ফিরিয়ে দিয়ে মুম্বাই শিবিরে প্রাথমিক ধাক্কা দেয়। কিন্তু এরপরও মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স একটি শক্তিশালী পাওয়ারপ্লে স্কোর গড়তে সক্ষম হয়। রায়ান রিকলটন এবং নামান ধীর ব্যাট হাতে ঝড় তুলে কিছু বড় শট খেলেন, যা চেন্নাইয়ের বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। রিকলটন তার স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে খেলছিলেন, অন্যদিকে নামান ধীরও দারুণ সমর্থন দিচ্ছিলেন। তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মুম্বাই পাওয়ারপ্লেতে দ্রুত রান তুলতে সক্ষম হয়, যা প্রথম উইকেটের পতনের পর দলের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।
শুভম দুবের হাত থেকে ফসকে গেল ‘সিটার’ ক্যাচ: ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট?
পাওয়ারপ্লে যখন একটি নিখুঁত নোটে শেষ হয়েছিল, ঠিক তখনই স্পিনারদের আগমন ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারতো। ফিল্ডিং বিধিনিষেধ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আক্রমণে আনা হয় অভিজ্ঞ স্পিনার নূর আহমেদকে। তাঁর প্রথম ওভারেই মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের ওপর দ্বিগুণ আঘাত হানার সুযোগ ছিল, কিন্তু শুভম দুবের একটি সহজ ক্যাচ মিসের কারণে তা সম্ভব হয়নি। এটি ছিল এবারের টাটা আইপিএল ২০২৬-এর অন্যতম সহজ ক্যাচগুলির মধ্যে একটি, যা দুবে হাতছাড়া করেন।
ঘটনাটি ঘটে পাওয়ারপ্লে শেষ হওয়ার ঠিক পরেই। নূর আহমেদের প্রথম ওভারের প্রথম বলেই নামান ধীর কাট শট খেলার চেষ্টা করেন। বল পিচ থেকে বেশ দেরিতে আসে, যা ব্যাটারের বাইরের কানা ছুঁয়ে শর্ট থার্ড ম্যানের দিকে উড়ে যায়। সেখানে ফিল্ডিং করছিলেন শুভম দুবে। একজন আন্তর্জাতিক মানের ফিল্ডার হিসেবে এই ধরনের ক্যাচ লুফে নেওয়া তার জন্য একেবারেই কঠিন কাজ ছিল না। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে, দুবে অত্যন্ত সহজ একটি ক্যাচ ফেলে দেন। খেলার প্রেক্ষাপটে এটি ছিল সবচেয়ে সহজ ক্যাচগুলির একটি, যা ম্যাচের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারতো। এই ক্যাচ মিস শুধু নামান ধীরকে একটি জীবনদানই দেয়নি, বরং নূর আহমেদের মনোবলেও কিছুটা প্রভাব ফেলেছিল। ক্রিকেটপ্রেমীরা সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ক্যাচ মিস নিয়ে বিস্তর আলোচনা করেছেন, এবং অনেকে বিশ্বাস করেন এটি ছিল একটি ‘সিটার’ ক্যাচ, যা কোনো পেশাদার ক্রিকেটারই মিস করতে চান না।
এই মুহূর্তে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি দেখুন:
You beauty Shivam dube 🤡🫶 #CSK pic.twitter.com/xAKT2e3FlE
নূর আহমেদের প্রত্যাবর্তন ও রায়ান রিকলটনের বিদায়
শুভম দুবের ক্যাচ মিসের পর নূর আহমেদ হতাশ হননি। বরং মা চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে তার বোলিংয়ে একটি দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন দেখা যায়। পাওয়ারপ্লে শেষ হওয়ার পর তার প্রথম ওভারেই তিনি রায়ান রিকলটনকে আউট করে দেন। আগের ম্যাচে সেঞ্চুরি করা রিকলটন এই ম্যাচেও চমৎকার শুরু করেছিলেন, কিন্তু ঠিক যখন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের ইনিংসকে মাঝের ওভারে দ্রুত গতিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন ছিল, তখনই তিনি আউট হয়ে যান।
একটি দুর্দান্ত শুরু করার পর রিকলটন ৩৭ রানে আউট হন। নূর আহমেদ তার প্যাডে বল করে তাকে ফাঁদে ফেলেন। বামহাতি এই ব্যাটার স্কয়ার লেগের ওপর দিয়ে বাউন্ডারি ক্লিয়ার করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু টাইমিং মিস করেন এবং ভুল শট খেলে বসেন, যার ফলে তিনি উইকেট হারান। রিকলটনের এই উইকেট মুম্বাইয়ের জন্য একটি বড় ধাক্কা ছিল, কারণ তিনি দলের রানের গতি বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছিলেন। তার অনুপস্থিতি দলের মিডল অর্ডারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে।
সূর্যকুমার যাদবের ফর্মহীনতা ও হতাশাজনক বিদায়
এই আইপিএল মরসুমে সূর্যকুমার যাদব ব্যাট হাতে খুব খারাপ সময় পার করছেন। এই মৌসুমে তার ব্যাটিং গড় ২০-এর নিচে, যা তার মতো একজন বিশ্বমানের ব্যাটারের জন্য খুবই হতাশাজনক। দলের দুটি দ্রুত উইকেট হারানোর পর তিনি যখন ব্যাট করতে আসেন, তখন তার ওপর প্রত্যাশার চাপ ছিল অনেক বেশি। সূর্য কিছু ভালো শট খেলে একটি প্রতিশ্রুতিশীল শুরু করেছিলেন। তিনি ভালো স্ট্রাইক রেটে ব্যাট করছিলেন এবং তার পরিচিত কিছু ফ্লিক ও কভার ড্রাইভ খেলেন, যা দেখে মনে হচ্ছিল তিনি হয়তো তার ফর্ম ফিরে পেতে চলেছেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অভিষেক হওয়া বোলার রামকৃষ্ণ ঘোষের একটি ডেলিভারিতে তিনি আউট হয়ে যান। ঘোষের বল অফসাইড বাউন্ডারিতে থাকা একমাত্র ফিল্ডারের হাতে জমা পড়ে, এবং সূর্যকুমারকে প্যাভিলিয়নে ফিরতে হয়। ভারতীয় অধিনায়কের এই বিদায় মুম্বাইকে আরও বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। সূর্যকুমারের ফর্মহীনতা মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের জন্য একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ তার মতো একজন অভিজ্ঞ ব্যাটার মাঝের ওভারে দলের রানের গতি বজায় রাখতে এবং ইনিংসকে স্থিতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মুম্বাইয়ের গভীর সংকট
উইল জ্যাকসের দ্রুত বিদায়, নামান ধীরের জীবনদান সত্ত্বেও তার ব্যর্থতা, রায়ান রিকলটনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট হারানো এবং সূর্যকুমার যাদবের অপ্রত্যাশিত বিদায় – সব মিলিয়ে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স গভীর সংকটে পড়েছিল। চেন্নাই সুপার কিংসের বোলাররা বিশেষ করে নূর আহমেদ মাঝের ওভারে দারুণ নিয়ন্ত্রণ দেখিয়েছেন। এই ম্যাচটি মুম্বাইয়ের জন্য কেবল একটি পরাজয়ের প্রতিশোধের সুযোগ ছিল না, বরং তাদের এবারের আইপিএল যাত্রায় নিজেদের অবস্থান মজবুত করারও একটি পরীক্ষা ছিল। শুভম দুবের ক্যাচ মিসের মুহূর্তটি হয়তো ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারতো, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মুম্বাইয়ের ব্যাটসম্যানরা সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়।
ক্রিকেটঅ্যাডিকট-এর লেখক শুভময় দত্ত জুন ২ তারিখ থেকে এই ওয়েবসাইটে কাজ করছেন…
0 Comments