রাজস্থান রয়্যালসের ১.৬৫ বিলিয়ন ডলারের মেগা ডিল এবং নেপথ্যের বিতর্ক
আইপিএল ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম চুক্তি হিসেবে রাজস্থান রয়্যালসের মালিকানা হস্তান্তর প্রক্রিয়া এই সপ্তাহে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। স্টিল ম্যাগনেট লক্ষ্মী নিবাস মিত্তাল এবং আর্সেলর মিত্তালের আদিত্য মিত্তালের নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়াম এই ফ্র্যাঞ্চাইজিটি কিনে নিয়েছে। এই শক্তিশালী কনসোর্টিয়ামে আরও রয়েছেন সিরাম ইনস্টিটিউটের সিইও আদার পুনাওয়ালা এবং ফ্র্যাঞ্চাইজিটির বর্তমান বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ। তবে এই মেগা ডিলটি সম্পন্ন হওয়ার মুখেই শুরু হয়েছে এক বিশাল বিতর্ক।
চলতি বছরে এটি দ্বিতীয়বার যখন রাজস্থান রয়্যালস বিক্রির খবর প্রকাশ্যে এলো। ১.৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই বিশাল চুক্তিতে শুধুমাত্র ভারতের আইপিএল দলই নয়, বরং বিদেশের মাটিতে রাজস্থান রয়্যালসের অন্যান্য টি২০ ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এই খুশির খবরের মাঝেই মেঘ হয়ে দেখা দিয়েছে কাল সোমানি কনসোর্টিয়ামের অভিযোগ। তাদের দাবি, তারা এই চুক্তিতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকলেও তাদের অন্যায়ভাবে ‘চিট আউট’ বা প্রতারণা করে বের করে দেওয়া হয়েছে।
নতুন মালিকানার বিন্যাস ও আর্থিক অংক
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিত্তাল পরিবার এই নতুন চুক্তিতে সিংহভাগ অর্থাৎ ৬৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, সিরাম ইনস্টিটিউটের আদার পুনাওয়ালার হাতে থাকবে ১৮ শতাংশ শেয়ার। রাজস্থান রয়্যালসের বর্তমান মালিক মনোজ বাদালের নেতৃত্বাধীন একটি গ্রুপ বাকি ৭ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা ধরে রাখবে। ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের মধ্যে এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে, যা ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড (BCCI) এবং কম্পিটিশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া (CCI)-এর অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে।
কাল সোমানি কনসোর্টিয়ামের বিষ্ফোরক অভিযোগ
২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রথম প্রতিবেদন এসেছিল যে, মার্কিন টেক-উদ্যোক্তা কাল সোমানির নেতৃত্বাধীন একটি কনসোর্টিয়াম রাজস্থান রয়্যালস কেনার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে। সোমানির এই কনসোর্টিয়ামে ছিলেন ওয়ালমার্ট পরিবারের রব ওয়ালটন এবং ফোর্ড হ্যাম্প পরিবারের মাইকেল হ্যাম্প। উল্লেখ্য, ওয়ালটন এবং হ্যাম্প উভয়েরই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এনএফএল (National Football League) ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকানার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
সোমানির গ্রুপ প্রায় ৬ মাস আগে ১.৬৩৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বিড জমা দিয়েছিল এবং চুক্তিটি প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছিল। তবে সম্প্রতি কিছু সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয় যে, সোমানি কনসোর্টিয়াম সময়মতো প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করতে না পারায় তারা এই চুক্তি থেকে পিছিয়ে গেছে। এবার সেই দাবির কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে সোমানি গ্রুপ।
‘আমাদের সাথে অবিচার করা হয়েছে’ — সোমানি কনসোর্টিয়ামের বিবৃতি
রেভস্পোর্টজ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাল সোমানি, জর্ডান এবং হ্যাম্প একটি যৌথ বিবৃতিতে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, প্রেসের মাধ্যমে ছড়ানো খবরগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিবৃতিতে তারা বলেন:
“দীর্ঘ ছয় মাসের প্রক্রিয়ায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লিড বিডার হওয়া সত্ত্বেও রাজস্থান রয়্যালসের মালিকানা গ্রুপের অংশ হতে না পেরে আমরা গভীরভাবে হতাশ। আমাদের কনসোর্টিয়াম এনএফএল, এমএলবি, ইপিএল, লা লিগা এবং টিজিএল-এ মালিকানার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একদল বিশিষ্ট বিনিয়োগকারীকে একত্রিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিল। আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল আইপিএলকে নতুন আন্তর্জাতিক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া।”
তারা আরও যোগ করেছেন, “সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বিপরীতে, আমাদের গ্রুপ শুরু থেকেই সম্পূর্ণ অর্থায়নে প্রস্তুত ছিল এবং আমরা কখনই আমাদের বিড প্রত্যাহার করিনি। আমাদের কাছে সমস্ত নথিপত্র ছিল এবং আমাদের বলা হয়েছিল যে শনিবার ফ্র্যাঞ্চাইজির বোর্ড মিটিংয়ে আমাদের কনসোর্টিয়ামকে অনুমোদন দেওয়া হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা ঘটেনি। আমরা সততা ও পেশাদারিত্বের সাথে এগিয়েছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটি যথেষ্ট ছিল না।”
স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন
সোমানি গ্রুপ সরাসরি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেছে, “আমরা বিশ্বাস করি না যে এই প্রক্রিয়ার ফলাফল একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বা সমতার ভিত্তিতে হয়েছে। স্বচ্ছতা এবং সততার অভাব আমাদের হতাশ করেছে। তবুও আমরা রাজস্থান রয়্যালসের ভবিষ্যৎ সাফল্য কামনা করি।”
এই অভিযোগের পর আইপিএলের অন্দরমহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও মিত্তাল গ্রুপ বা বিসিসিআই এখনও এই অভিযোগ নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ১.৬৫ বিলিয়ন ডলারের এই ডিলটি আইপিএলের ক্রমবর্ধমান ব্র্যান্ড ভ্যালুকেই প্রমাণ করে, যদিও বিতর্কের এই কালো ছায়া ফ্র্যাঞ্চাইজিটির ভাবমূর্তিতে কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলতে পারে।
উপসংহার
রাজস্থান রয়্যালসের এই মালিকানা পরিবর্তন আইপিএলের জন্য একটি যুগান্তকারী ঘটনা হতে পারতো, কিন্তু কাল সোমানি কনসোর্টিয়ামের এই গুরুতর অভিযোগ পুরো প্রক্রিয়াটিকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, বিসিসিআই এই অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে কি না এবং মিত্তাল পরিবারের এই বিশাল চুক্তি কোনো আইনি বা প্রশাসনিক বাধার মুখে পড়ে কি না। আইপিএল ২০২৬-এর আগে এই মালিকানা নাটক কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে ক্রিকেট বিশ্ব।
0 Comments