[CRK] প্রতিকা রওয়ালের আবেগঘন কথা: ইনজুরি, জয় এবং সেই কাঙ্ক্ষিত মেডেলের গল্প
[CRK]
আবেগ এবং সংকল্পের গল্প: হুইলচেয়ার থেকে বিশ্বজয়
ক্রিকেট মাঠে যখন ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার লড়াই চলছিল, তখন গ্যালারির এক কোণে হুইলচেয়ারে বসে নিঃশব্দে কিন্তু গভীরভাবে সেই মুহূর্তগুলো অনুভব করছিলেন প্রতিকা রওয়াল। ভারতীয় দলের ওপেনার প্রতিকা টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল—দুটো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচই মিস করেছেন মারাত্মক ইনজুরির কারণে। তবে দলের শিরোপা জয়ের পর তার আনন্দ ছিল বাঁধনহারা। হুইলচেয়ারে বসেই সতীর্থদের সাথে সেই উল্লাস, যা কেবল একজন খেলোয়াড়ের নয়, বরং একজন যোদ্ধার মানসিক শক্তির পরিচয় দেয়।
মেডেল পাওয়ার সেই বিশেষ মুহূর্ত
বিশ্বকাপ জয়ের পর প্রতিটি খেলোয়াড়ের জন্য সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত হলো গলায় মেডেলটি পরানো। তবে প্রতিকার ক্ষেত্রে এটি কিছুটা নাটকীয় মোড় নিয়েছিল। টুর্নামেন্ট থেকে বাইরে হয়ে যাওয়ায় শুরুতে তাকে মেডেল দেওয়া হয়নি। প্রতিকা জানান, শুরুতে সাপোর্ট স্টাফদের একজনের মেডেল তিনি সাময়িকভাবে ধার করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহের বিশেষ উদ্যোগে তার নিজস্ব মেডেলটি তার কাছে পৌঁছায়।
এই বিষয়ে প্রতিকা বলেন, “আমার এখন নিজস্ব মেডেল আছে। কেউ একজন আমাকে বলেছিল যে জয় শাহ স্যার আমার জন্য মেডেল পাঠিয়েছেন। আমি খুব খুশি হয়েছিলাম, যদিও অনলাইনে অনেকে বিষয়টিকে বড় করে দেখেছিল। আসতে কিছুটা সময় লেগেছে, তবে শেষ পর্যন্ত তা আমার কাছে পৌঁছেছে।”
শফালি ভার্মার ওপর অগাধ বিশ্বাস
প্রতিকার অনুপস্থিতিতে ওপেনিংয়ে তার জায়গা নিয়েছিলেন শফালি ভার্মা। শফালি কেবল সেই শূন্যস্থান পূরণই করেননি, বরং সেমিফাইনাল এবং ফাইনালে বিধ্বংসী ব্যাটিং করেছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ফাইনালে ৮৭ রান এবং দুটি উইকেট নিয়ে তিনি ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হন। প্রতিকা জানান, শফালির এই সাফল্যের পেছনে কোনো বিশেষ মোটিভেশনের প্রয়োজন ছিল না।
প্রতিকা এবং শফালির মধ্যকার একটি কথোপকথন প্রকাশ করে তাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা। প্রতিকা বলেন, “শফালির মোটিভেশনের প্রয়োজন হয় না; সে তার সহজাত প্রবৃত্তি এবং বিশ্বাসের সাথে খেলে। ফাইনালের আগে সে আমার কাছে এসে বলেছিল, ‘আমি সত্যিই দুঃখিত যে তুমি খেলতে পারছ না।’ আমি তাকে বলেছিলাম যে ঠিক আছে, এসব হয়ে থাকে। আমার মনেই হয়েছিল যে সেদিন সে বিশেষ কিছু করে দেখাবে।”
মানসিক লড়াই এবং মনস্তত্ত্বের প্রভাব
বাংলাদেশ দলের বিপক্ষে শেষ লিগ ম্যাচে ফিল্ডিং করার সময় গোড়ালি এবং হাঁটুতে গুরুতর ইনজুরি পান প্রতিকা। একজন অ্যাথলেটের জন্য টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত পর্যায়ে মাঠের বাইরে যাওয়া অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। তবে প্রতিকা এই ধাক্কাকে সহজভাবে নিয়েছেন। এর পেছনে বড় কারণ হলো তার শিক্ষা। তিনি একজন সাইকোলজি বা মনস্তত্ত্বের শিক্ষার্থী।
প্রতিকা ব্যাখ্যা করেন, “মনস্তত্ত্ব পড়ার কারণে মানুষের আবেগ, বিশেষ করে নিজের আবেগগুলো বোঝা আমার জন্য সহজ হয়েছে। প্রথম কাজ ছিল যা ঘটেছে তা মেনে নেওয়া। কারণ যা হয়ে গেছে তা আর বদলানো সম্ভব নয়। একবার ইনজুরি মেনে নেওয়ার পর, আমি কেবল সেই বিষয়গুলোতে মনোযোগ দিয়েছি যা আমার নিয়ন্ত্রণে ছিল—যেমন রিকভারি, পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টি এবং দলকে সমর্থন করা।”
পরিবারের সমর্থন এবং বাবার আবেগ
প্রতিকা স্বীকার করেছেন যে এই কঠিন সময়ে তার পরিবারের সমর্থন ছিল অমূল্য। কোচ শ্রবন কুমার এবং তার মা, বাবা ও ভাই তাকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেননি। তবে প্রতিকার চেয়েও তার বাবা এই ইনজুরিকে বেশি কষ্ট দিয়ে মেনে নিয়েছিলেন।
আবেগঘন হয়ে প্রতিকা বলেন, “আমি খুব সহজে আবেগ প্রকাশ করি না, কিন্তু আমার বাবা অনেক কেঁদেছিলেন। উল্টো আমাকে তাকে শান্ত করতে হয়েছিল। আমার চারপাশের এই সাপোর্ট সিস্টেম আমাকে কখনোই একা অনুভব করতে দেয়নি।”
পরিসংখ্যান এবং ব্যাটিং দর্শন
২০২৪ সালে অভিষেকের পর থেকে প্রতিকা রওয়ালের উত্থান নজরকাড়া। ২৪টি ওয়ানডে ম্যাচে তিনি ১১১০ রান করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে দুটি সেঞ্চুরি এবং সাতটি হাফ-সেঞ্চুরি। ৫০.৪৫ এর গড় তার নির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ দেয়। তবে স্ট্রাইক রেট নিয়ে বাইরে থেকে কিছু সমালোচনা আসলেও, দলের কোচ অমল মুজুমদারের পূর্ণ সমর্থন পেয়েছেন তিনি।
নিজের ব্যাটিং পদ্ধতি সম্পর্কে প্রতিকা বলেন, “আমি নির্দিষ্ট কোনো রোলে বিশ্বাস করি না। প্রতিটি ম্যাচ আলাদা কিছু দাবি করে। যদি স্মৃতি মান্ধানা দ্রুত আউট হয়ে যান, তবে আমাকে ইনিংসটি ধরে রাখতে বলা হয়। আবার যদি দ্রুত রানের প্রয়োজন হয়, তবে আমাকে গতি বাড়াতে বলা হয়। আমার কাছে ব্যক্তিগত মাইলস্টোনের চেয়ে দলের ছন্দ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
প্রত্যাবর্তনের পথে প্রতিকা
বর্তমানে প্রতিকা তার রিকভারি নিয়ে আশাবাদী। তিনি জানিয়েছেন যে তিনি এখন অনেক ভালো অনুভব করছেন এবং হালকা মোবিলিটি এক্সারসাইজ শুরু করেছেন। খুব শীঘ্রই তার এক্স-রে হবে এবং চিকিৎসকের সবুজ সংকেত পেলেই তিনি আবার ব্যাটিং অনুশীলনে ফিরবেন।
- বর্তমান লক্ষ্য: রিহ্যাব যথাযথভাবে সম্পন্ন করা।
- আগামী লক্ষ্য: ঘরোয়া ক্রিকেট মৌসুমে পূর্ণ শক্তিতে ফিরে আসা।
- আকাঙ্ক্ষা: পুনরায় সেই జోনে ফিরে যাওয়া যেখানে তিনি সারাদিন ব্যাটিং করেও ক্লান্ত হন না।
প্রতিকা রওয়ালের এই যাত্রা আমাদের শেখায় যে, শারীরিক আঘাত সাময়িক হতে পারে, কিন্তু মানসিক দৃঢ়তা এবং সঠিক সমর্থন থাকলে যেকোনো বাধা অতিক্রম করে বিজয়ী হওয়া সম্ভব। ভারতীয় ক্রিকেট প্রেমীরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাদের এই দক্ষ ওপেনারের মাঠে প্রত্যাবর্তনের জন্য।
