[CRK] এলএসজি-র ব্যাটিং বিপর্যয়: নিকোলাস পুরানই কি মূল সমস্যা? ডেল স্টেইনের বিস্ফোরক মন্তব্য
[CRK]
লাখনউয়ের মাটিতে দুঃস্বপ্ন: ব্যাটিং বিপর্যয়ে দিশেহারা এলএসজি
আইপিএল ২০২৬ আসরে নিজেদের ঘরের মাঠে লাখনউ সুপার জায়ান্টস (LSG)-এর অবস্থা এখন শোচনীয়। এই মরশুমে লাখনউতে তিনটি ম্যাচ খেলেছে তারা এবং তিনটি ম্যাচেই তাদের পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। সর্বশেষ বুধবার রাজস্থান রয়্যালস (RR)-এর বিরুদ্ধে ৪০ রানের বড় ব্যবধানে হেরে যাওয়াটি ছিল তাদের এই দুঃস্বপ্নেরই ধারাবাহিকতা। দলের কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গার এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে পিচের সাথে মানিয়ে নিতে না পারার কথা বললেও, ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ ও প্রাক্তন ক্রিকেটারদের মত ভিন্ন।
ফাফ ডু প্লেসিস এবং ডেল স্টেইনের মতে, এলএসজি-র এই পতনের মূল কারণ কেবল পিচ নয়, বরং দলের ব্যাটিং পরিকল্পনায় চরম বিশৃঙ্খলা এবং তারকা ব্যাটার নিকোলাস পুরানের অবিশ্বাস্য খারাপ ফর্ম।
ব্যাটিং অর্ডারের অরাজকতা ও ফাফ ডু প্লেসিসের পর্যবেক্ষণ
বুধবার রাজস্থান রয়্যালস বনাম ম্যাচে ১৬০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে এলএসজি-র ব্যাটিং অর্ডারে দেখা যায় এক অদ্ভুত পরীক্ষা। মিচেল মার্শ এবং আয়ুশ বাদোনি ওপেনিং করেন, আর এইডেন মার্করামকে নামানো হয় চার নম্বরে। অন্যদিকে রিশভ পান্ত এবং নিকোলাস পুরান ব্যাটিং করেন পাঁচ নম্বরে। মজার ব্যাপার হলো, আগের ম্যাচেও শীর্ষ তিন ব্যাটার একই ছিলেন, কিন্তু তার আগের ম্যাচে মার্করাম ওপেনিং করেছিলেন এবং বাদোনি ছিলেন পাঁচ নম্বরে। পান্ত, পুরান এবং বাদোনিকে নিয়ে কোচিং স্টাফের এই ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা দলের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করছে বলে মনে করছেন ফাফ ডু প্লেসিস।
ESPNcricinfo-র ‘TimeOut’ শো-তে কথা বলার সময় ডু প্লেসিস বলেন, “আপনার শক্তি কী? কোন জিনিসটি আপনাদের জন্য কাজ করেছে? সেটির সাথেই থাকুন। গত বছর মার্শ এবং মার্করামের ওপেনিং জুটি দারুণ কাজ করেছিল। কিন্তু এখন তারা প্রতিটি শূন্যস্থান পূরণ করার চেষ্টা করছে, যা কার্যত অসম্ভব। সবাইকে খুশি করার চেষ্টা করলে শেষ পর্যন্ত কেউ খুশি হয় না। জিনিসগুলো যতটা সম্ভব সহজ রাখা উচিত ছিল। তারা মার্করামকে মিডল অর্ডারে পাঠিয়ে স্থিতিশীলতা আনতে চেয়েছে, কিন্তু এর ফলে পাওয়ারপ্লে-তেই তারা দ্রুত উইকেট হারাচ্ছে। এটি বড্ড বেশি জটিল হয়ে যাচ্ছে।”
ডেল স্টেইনের বিস্ফোরক দাবি: পুরানই কি মূল কারণ?
ফাফ ডু প্লেসিস যেখানে কৌশলী আলোচনা করেছেন, ডেল স্টেইন সেখানে সরাসরি আঙুল তুলেছেন নিকোলাস পুরানের দিকে। স্টেইনের মতে, পুরানের ফর্মের অবনতিই হলো এই পুরো বিশৃঙ্খলার মূল অনুঘটক বা ‘ক্যাটালিস্ট’।
স্টেইন বলেন, “পুরানই এই সমস্যার মূল কারণ। পুরানের খারাপ ফর্মের কারণে দলের অন্যান্য ভালো ব্যাটারদের অকারণে ব্যাটিং অর্ডারে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে তাকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া যায়। আমার মনে হয়, কোচের মনে কোথাও একটা সন্দেহ আছে, কিন্তু তারা জানেন পুরানের সম্ভাবনা কত বেশি, তাই তাকে ড্রপ করতে পারছেন না।”
স্টেইন আরও যোগ করেন, “পুরান যখন রান করতে পারছেন না, তখন মিডল অর্ডারে কাউকে একজন স্থিতিশীল রাখতে হয়। আর সেই কারণেই মার্করামকে তার স্বাভাবিক ওপেনিং পজিশন থেকে সরিয়ে মিডল অর্ডারে পাঠানো হচ্ছে। তারা আসলে পুরানকে ড্রপ করতে ভয় পাচ্ছেন কারণ ম্যাথিউ ব্রীটজকের মতো বিকল্প খেলোয়াড়দের ওপর তাদের পূর্ণ আস্থা নেই।”
পরিসংখ্যান যা বলে: খাদের কিনারে পুরান
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় স্টেইনের দাবি কতটা যুক্তিযুক্ত। এই মরশুমে সাতটি ম্যাচ খেলে নিকোলাস পুরানের সর্বোচ্চ স্কোর মাত্র ২২ রান। তার মোট সংগ্রহ ৭৩ রান এবং স্ট্রাইক রেট মাত্র ৮২.০২, যা একজন টি-টোয়েন্টি পাওয়ার হিটারের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক। বিপরীতে মার্শ, মার্করাম এবং পান্ত খুব আহামরি পারফর্ম না করলেও পুরানের তুলনায় অনেক ভালো অবস্থায় আছেন।
- গত মরশুম: মিচেল মার্শ ৬০০+ রান, নিকোলাস পুরান ৫০০+ রান এবং এইডেন মার্করাম প্রায় ৪৫০ রান করেছিলেন।
- বর্তমান মরশুম: পুরানের স্ট্রাইক রেট কমে দাঁড়িয়েছে ৮২.০২-এ, যা দলের ব্যাটিং গতিকে স্তিমিত করে দিয়েছে।
কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গারের আত্মপক্ষ সমর্থন
সাত ম্যাচে পাঁচবার পরাজয়ের মুখে কোচ জাস্টিন ল্যাঙ্গার স্বীকার করেছেন যে দলের ব্যাটিং বিভাগ এখন খাদের কিনারে। তবে তিনি বোলিং বিভাগের প্রশংসা করতে ছাড়েননি। ল্যাঙ্গার বলেন, “হ্যাঁ, আমরা এখনো নিজেদের ছন্দ খুঁজে পাইনি। তবে আমাদের বোলিং বিভাগ দারুণ কাজ করছে। মোহসিন খান এবং প্রিন্স যাদব অসাধারণ খেলছে, তারা ভবিষ্যতে ভারতের হয়ে খেলবে বলে আমার বিশ্বাস। ময়াঙ্ক যাদব পিঠের অস্ত্রোপচারের পর দারুণ সাহস দেখিয়ে ফিরে এসেছে। এছাড়া শামি এবং দিবেশ রাঠিও ভালো বল করেছেন।”
ব্যাটিং অর্ডারের পরিবর্তন নিয়ে ল্যাঙ্গার যুক্তি দেন যে, গত বছর যা কাজ করেছিল তা এই বছর কাজ নাও করতে পারে। তিনি বলেন, “এইডেন (মার্করাম) একজন নিঃস্বার্থ খেলোয়াড়। আমরা মনে করেছি টি-টোয়েন্টিতে মিডল অর্ডারে ব্যাটিং করা সবচেয়ে কঠিন, তাই নিকি (পুরান) এবং এইডেনের মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সেখানে রাখা প্রয়োজন ছিল। আমরা অনেক চিন্তাভাবনা করে এই পরিবর্তন করেছি। পাঞ্জাব কিংসের বিরুদ্ধে আমাদের ব্যাটিং সেরা ছিল, কিন্তু আজ আমরা পাওয়ারপ্লে-তে উইকেট হারিয়ে লড়াই করতে পারিনি। এটি আমাদের এবং ভক্তদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।”
পরিশেষে, লাখনউ সুপার জায়ান্টস যদি এই মরশুমে ঘুরে দাঁড়াতে চায়, তবে তাদের ব্যাটিং অর্ডারে স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং নিকোলাস পুরানকে দ্রুত তার পুরনো ফর্মে ফিরতে হবে। অন্যথায়, কোচের এই ‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা’ এলএসজি-কে আরও বড় সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
