২৭ কোটির বিশাল চাপ এবং ভারত অরুণের সাফাই
আইপিএল ২০২৬-এর নিলামে যখন ২৭ কোটি টাকার বিনিময়ে ঋষভ পান্তকে লখনউ সুপার জায়ান্টস (LSG) দলে নিয়েছিল, তখন ক্রিকেট বিশ্বে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। আইপিএলের ইতিহাসে সবথেকে দামি ক্রিকেটার হিসেবে নাম লিখিয়েছিলেন এই বাঁহাতি উইকেটকিপার ব্যাটার। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ দেখতেও বেশি সময় লাগেনি। চলমান সিজনে পান্তের ব্যাট যেন কথা বলতে ভুলে গেছে। এই অফ-ফর্ম নিয়ে যখন চারদিকে সমালোচনার ঝড় বইছে, ঠিক তখনই পান্তের সমর্থনে এগিয়ে এলেন লখনউয়ের বোলিং কোচ ভারত অরুণ।
ভারত অরুণ মনে করেন, বিশাল এই প্রাইস ট্যাগ বা মূল্যের চাপ ঋষভ পান্তকে মোটেও বিচলিত করছে না। তিনি দাবি করেছেন, পান্তের মতো একজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড় জানেন কীভাবে চাপের মুখে ঘুরে দাঁড়াতে হয়। কোচের ভাষায়, ‘আমি মনে করি না গত দুই বছরে ২৭ কোটি টাকার প্রাইস ট্যাগ ঋষভ পান্তকে কোনোভাবে দমিয়ে রেখেছে। সে আমাদের দ্বিতীয় ম্যাচে জয় এনে দিয়েছিল। এটা আসলে মাত্র একটি ভালো ইনিংসের ব্যাপার মাত্র।’
ফর্মে ফেরার লড়াই: দুর্ঘটনার পর কঠিন পথচলা
২০২২ সালের সেই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনার পর ঋষভ পান্তের ক্রিকেটে ফেরাটা ছিল অনেকটা রূপকথার মতো। প্রায় এক বছরেরও বেশি সময় মাঠের বাইরে থাকার পর তিনি যখন ২২ গজে ফিরলেন, প্রত্যাশার পারদ ছিল আকাশচুম্বী। লাল বলের ক্রিকেটে বা টেস্ট ফরম্যাটে তিনি নিজের ধার বজায় রাখলেও সাদা বলের ক্রিকেটে, বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে তিনি আগের সেই বিধ্বংসী মেজাজ হারিয়ে ফেলেছেন বলে মনে হচ্ছে।
২০২৪ সালের আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ী ভারতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন ঋষভ পান্ত। তবে টুর্নামেন্ট জুড়ে তার ব্যক্তিগত অবদান ছিল অত্যন্ত সীমিত। লাল বলের ক্রিকেটে তিনি যতটা স্বচ্ছন্দ, সাদা বলের সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটে সেই একই পারফরম্যান্সের পুনরাবৃত্তি করতে তিনি হিমশিম খাচ্ছেন। লখনউ সুপার জায়ান্টসের অধিনায়ক হিসেবেও তিনি গত দুই মরসুমে দলকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য এনে দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
পরিসংখ্যানের আয়নায় পান্তের ব্যর্থতা
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে পান্তের ফর্মের অবনতি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। গত দুই মরসুম ধরে তিনি তার আইপিএল ক্যারিয়ারের সবথেকে খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। ২০২৫ সালের আইপিএলে তিনি শেষ ম্যাচে একটি শতরান করলেও পুরো টুর্নামেন্টে সংগ্রহ করেছিলেন মাত্র ২৬৯ রান। চলতি ২০২৬ মরসুমেও পরিস্থিতি বদলায়নি। আটটি ম্যাচ খেলার পর তার নামের পাশে জমা হয়েছে মাত্র ১৮৯ রান।
সবথেকে উদ্বেগের বিষয় হলো তার স্ট্রাইক রেট। একসময় ঋষভ পান্ত মানেই ছিল ১৫০ থেকে ১৬০ স্ট্রাইক রেটে বিধ্বংসী ব্যাটিং। কিন্তু লখনউ সুপার জায়ান্টসে যোগ দেওয়ার পর তার স্ট্রাইক রেট কমে ১২৫ থেকে ১৩০-এর ঘরে নেমে এসেছে। মিডল অর্ডারে তার এই মন্থর ব্যাটিং দলের স্কোরবোর্ডে বড় প্রভাব ফেলছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই হারের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
লখনউ সুপার জায়ান্টসের করুণ দশা
শুধুমাত্র ব্যক্তিগতভাবে পান্ত নন, দল হিসেবে লখনউ সুপার জায়ান্টসও এই মুহূর্তে খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে। বিশেষ করে নিজেদের ঘরের মাঠে তাদের পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। ঘরের মাঠের অধিকাংশ ম্যাচেই তারা হেরেছে। এমনকি শেষ ম্যাচে কেকেআর-এর বিরুদ্ধে ১৫০ রানের সামান্য লক্ষ্যমাত্রাও তাড়া করতে পারেনি পান্তের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ।
বর্তমানে পয়েন্ট টেবিলের একদম তলানিতে অবস্থান করছে সঞ্জীব গোয়েঙ্কার মালিকানাধীন এই দলটি। আটটি ম্যাচের মধ্যে মাত্র দুটিতে জিতে চার পয়েন্ট নিয়ে তাদের নেট রান রেটও অত্যন্ত শোচনীয়। ঘরের মাঠের ব্যর্থতা কাটিয়ে এবার তাদের পরবর্তী মিশন মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে। সেখানে তারা মুখোমুখি হবে নবম স্থানে থাকা মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের।
ওয়াংখেড়েতে কি দেখা যাবে ‘পুরানো’ পান্তকে?
লখনউয়ের ভক্তরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের ম্যাচের জন্য। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সও এই মরসুমে খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। ভারত অরুণের মতে, মুম্বাইয়ের ব্যাটিং সহায়ক পিচে ঋষভ পান্তের একটি ভালো ইনিংসই পারে পুরো দলের মানসিকতা বদলে দিতে। কোচের এই আস্থা পান্ত মাঠে কতটা প্রতিফলিত করতে পারেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। পান্তের কি ফর্মে ফেরার সময় শেষ হয়ে আসছে নাকি ২৭ কোটির এই বাজি শেষ পর্যন্ত সফল হবে? উত্তর মিলবে আগামী ম্যাচগুলোতে।
0 Comments