বিগ ব্যাশ লিগে বেসরকারিকরণের নতুন অধ্যায়: সিএ-র সাহসী পদক্ষেপ
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (CA) তাদের বিগ ব্যাশ লিগ (BBL) ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মালিকানা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছে। মেলবোর্ন রেনেগেডস, পার্থ স্করচার্স এবং হোবার্ট হারিকেনসের অংশীদারিত্ব উন্মুক্ত বাজারে বিক্রির মাধ্যমে তারা ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সম্ভাব্য বাজারমূল্য যাচাই করতে চায়। তবে এই প্রক্রিয়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিউ সাউথ ওয়েলস (NSW) এবং কুইন্সল্যান্ড, যারা সিএ-র এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
সিএ নিশ্চিত করেছে যে ভিক্টোরিয়া (মেলবোর্ন স্টারস এবং মেলবোর্ন রেনেগেডস-এর পরিচালক), পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া (পার্থ স্করচার্স-এর পরিচালক) এবং তাসমানিয়া (হোবার্ট হারিকেনস-এর পরিচালক) বিশ্ববাজারে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ যাচাইয়ের পরবর্তী ধাপে যেতে আগ্রহী। অন্যদিকে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া এখনই বিক্রির মিছিলে নামতে না চাইলেও, ভবিষ্যতে সফল বিক্রির সম্ভাবনা দেখে নিজেদের যুক্ত করার পথ খোলা রেখেছে।
আসলে কী বিক্রি করতে চাইছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া?
বিগ ব্যাশ ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মালিকানা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি রয়েছে। বর্তমানে আটটি ফ্র্যাঞ্চাইজির সবগুলোর মালিকানা ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার হাতে। রাজ্য সংস্থাগুলো কেবল এই দলগুলো পরিচালনার জন্য ৩০ বছরের লিজ বা ইজারা পেয়েছে। মজার বিষয় হলো, এই লিজের মেয়াদ এখন ঠিক মাঝামাঝি পর্যায়ে রয়েছে।
সিএ-র প্রস্তাব অনুযায়ী, রাজ্যগুলো তাদের ফ্র্যাঞ্চাইজির ৪৯% থেকে ৭৫% পর্যন্ত বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করতে পারবে। ভিক্টোরিয়া এবং নিউ সাউথ ওয়েলসের ক্ষেত্রে তাদের দ্বিতীয় ফ্র্যাঞ্চাইজিটির শতভাগ মালিকানা বিক্রির সুযোগও রাখা হয়েছে। যদি কোনো রাজ্য ৪৯% শেয়ার বিক্রি করে, তবে বাকি ৫১% মালিকানা সরাসরি রাজ্যের অধীনে চলে আসবে (যা আগে লিজের আওতায় ছিল)। তবে এই বিক্রির ফলে ভবিষ্যতের রাজস্ব রাজ্য এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে।
বিশ্ববাজারের সাথে তুলনা: ‘দ্য হান্ড্রেড’-এর শিক্ষা
ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার এই পরিকল্পনা অনেকটা ইংল্যান্ডের ‘দ্য হান্ড্রেড’ টুর্নামেন্টের ফ্র্যাঞ্চাইজি বিক্রির আদলে তৈরি। গ্লোবাল মার্চেন্ট ব্যাংক ‘দ্য রেইন গ্রুপ’ উভয় ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছে। ইংল্যান্ডে ট্রেন্ট রকেটস বা বার্মিংহাম ফিনিক্সের মতো ক্লাবগুলোর ভ্যালুয়েশন বা মূল্যমান প্রায় ১৪৯ থেকে ১৫৫ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার ধরা হয়েছে।
মেলবোর্ন রেনেগেডসের ক্ষেত্রে শতভাগ মালিকানা বিক্রির সম্ভাবনা আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর নজর কাড়তে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, মেলবোর্নে একটি পূর্ণাঙ্গ দলের মালিকানা পেতে ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হতে পারেন। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর বাজারমূল্য ৮০ মিলিয়ন থেকে ১৮০ মিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলারের মধ্যে ওঠানামা করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আইপিএল মালিকদের অনুপ্রবেশ ও উদ্বেগের কারণ
বেসরকারিকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হলো ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (IPL) মালিকদের অংশগ্রহণ। ইংল্যান্ডের ‘দ্য হান্ড্রেড’-এ ইতোমধ্যেই সান গ্রুপ, আরপিএসজি গ্রুপ এবং রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ বড় অংশীদারিত্ব কিনেছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা দলের নাম পরিবর্তন করে আইপিএল ব্র্যান্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছে (যেমন সানরাইজার্স লিডস)। অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটের অভ্যন্তরে একটি অংশের আশঙ্কা, আইপিএল মালিকরা এলে খেলার নিয়মকানুন, খেলোয়াড় নিয়োগ এবং সূচির ওপর তাদের অতিরিক্ত প্রভাব পড়তে পারে।
রাজ্যগুলোর আপত্তির নেপথ্যে কী কারণ?
নিউ সাউথ ওয়েলস এবং কুইন্সল্যান্ড কেন এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ সামনে এসেছে। নিউ সাউথ ওয়েলস বিজিবি-র জন্য একটি স্ব-অর্থায়ন প্রস্তাব পেশ করেছে। তাদের মতে, খেলাধুলার উন্নতির জন্য জুয়া বা বেটিং কোম্পানির বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। এনএসডাব্লু মনে করে, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া তাদের পন্যমূল্য বা ‘প্রোডাক্ট ফি’ থেকে সঠিক পাওনা পাচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
অন্যদিকে, ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী টড গ্রিনবার্গ জানিয়েছেন যে বেসরকারিকরণ অনিবার্য। তবে সব দলকে একসাথে বিক্রির আদি পরিকল্পনা সফল না হওয়ায় তারা ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাজ্যগুলোর মধ্যে একটি বড় বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাদের আর্থিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে। যেসব রাজ্য বড় স্টেডিয়াম প্রকল্প বা ঋণের চাপে আছে, তারা দ্রুত অর্থ সংগ্রহের জন্য বিক্রির পক্ষে।
পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে যাচ্ছে?
বাজার যাচাইয়ের এই প্রক্রিয়া থেকে প্রাপ্ত তথ্য সিএ-কে একটি পরিষ্কার ধারণা দেবে যে বিনিয়োগকারীরা আসলে কী শর্তে এবং কত মূল্যে এই দলগুলো কিনতে আগ্রহী। ভিক্টোরিয়া, পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া এবং তাসমানিয়া যদি সেই শর্তগুলোতে সন্তুষ্ট হয়, তবেই তারা আনুষ্ঠানিক নিলাম প্রক্রিয়ায় যাবে।
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, বাজার যাচাইয়ের আগেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা রাজ্যগুলোর জন্য কৌশলগত ভুল হতে পারে। তবে বিরোধিতাকারী রাজ্যগুলোর যুক্তি হলো, একবার গতি সঞ্চার হলে সিএ-র এই প্রক্রিয়া থামানো কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে তারা শুরুতেই বিকল্প উপায়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে চায়। শেষ পর্যন্ত বিগ ব্যাশ লিগ কি সম্পূর্ণ বেসরকারি মালিকানাধীন একটি টুর্নামেন্টে পরিণত হবে, নাকি রাজ্যগুলোর নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে, তা সময়ই বলে দেবে।
0 Comments