[CRK] আকাশ চৌধুরীর বিশ্বরেকর্ড: ১১ বলে দ্রুততম ফিফটি ও এক ওভারে ৬ ছক্কা
[CRK]
আকাশ চৌধুরীর অবিশ্বাস্য ব্যাটিং তাণ্ডব: ক্রিকেট বিশ্ব দেখল নতুন ইতিহাস
ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেট বা রঞ্জি ট্রফি বরাবরই নতুন প্রতিভার উত্থান এবং অবিশ্বাস্য সব রেকর্ডের সাক্ষী থেকেছে। তবে রবিবারের ঘটনাটি ছিল সম্পূর্ণ অন্য মাত্রার। সুরাটে অনুষ্ঠিত রঞ্জি ট্রফির প্লেট গ্রুপের ম্যাচে অরুণাচল প্রদেশের বিরুদ্ধে মেঘালয়ের অলরাউন্ডার আকাশ চৌধুরী এমন এক কীর্তি গড়েছেন, যা ক্রিকেট ইতিহাসে খুব কমই দেখা যায়। মূলত একজন মিডিয়াম পেসার হয়েও আকাশ ব্যাট হাতে যা করলেন, তা অনেক বিশ্বখ্যাত ব্যাটারের কাছেও স্বপ্নের মতো। মাত্র ১১ বলে নিজের অর্ধশতরান পূর্ণ করে তিনি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড নিজের নামে করে নিলেন।
এক ওভারে ৬ ছক্কা: গ্যারি সোবার্স ও রবি শাস্ত্রীর পাশে আকাশ
ম্যাচের দ্বিতীয় দিনে মেঘালয় যখন ৫৭৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বিশাল সংগ্রহের পথে ছিল, তখন আট নম্বর ব্যাটার হিসেবে ক্রিজে নামেন আকাশ চৌধুরী। ইনিংসের ১২৬তম ওভারে বল করতে আসেন অরুণাচল প্রদেশের বাঁ-হাতি স্পিনার লিমার ডাবি। সেই ওভারেই ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম বিরল দৃশ্যের অবতারণা করেন আকাশ। ওভারের ছয়টি বলই তিনি সীমানার বাইরে আছড়ে ফেলেন।
এক ওভারে ছয়টি ছক্কা মারার মাধ্যমে আকাশ চৌধুরী প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের সেই এলিট ক্লাবে প্রবেশ করলেন, যেখানে আগে থেকে নাম খোদাই করা আছে কিংবদন্তি গ্যারি সোবার্স এবং ভারতের সাবেক অধিনায়ক রবি শাস্ত্রীর। উল্লেখ্য যে, মাইক প্রোক্টরও টানা ছয়টি ছক্কা মেরেছিলেন, তবে তা ছিল দুটি ভিন্ন ওভারে। আকাশ এই কৃতিত্ব অর্জন করলেন মাত্র এক ওভারের মধ্যেই, যা তাকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে দিল।
টানা ৮টি ছক্কা এবং ১১ বলে দ্রুততম ফিফটি
লিমার ডাবির ওভারে ছয়টি ছক্কা মারার পর আকাশ চৌধুরী তার তাণ্ডব থামাননি। পরের ওভারে অফস্পিনার টিএনআর মোহিতের মুখোমুখি হয়ে প্রথম দুই বলে আরও দুটি ছক্কা হাঁকান তিনি। অর্থাৎ টানা আটটি বলে তিনি আটটি ছক্কা মারেন। এই বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের সৌজন্যে মাত্র ১১ বলে নিজের অর্ধশতরান পূর্ণ করেন ২৫ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।
এর আগে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ডটি ছিল লিস্টারশায়ারের ওয়েইন হোয়াইটের দখলে। ২০১২ সালে এসেক্সের বিরুদ্ধে তিনি ১২ বলে অর্ধশতরান করেছিলেন। আকাশ তাকে এক বলের ব্যবধানে টপকে নতুন বিশ্বরেকর্ড স্থাপন করলেন। এটি শুধুমাত্র বলের হিসেবে নয়, সময়ের হিসেবেও এক অবিশ্বাস্য অর্জন।
সময়ের নিরিখে দ্বিতীয় দ্রুততম অর্ধশতরান
ক্রিকেট পরিসংখ্যানবিদদের মতে, যেখানে তথ্য উপলব্ধ আছে, সেখানে সময়ের নিরিখে এটি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দ্বিতীয় দ্রুততম অর্ধশতরান। আকাশ চৌধুরী তার ফিফটি পূর্ণ করতে মাত্র ৯ মিনিট সময় নিয়েছেন। এই তালিকার শীর্ষে আছেন ক্লাইভ ইনম্যান, যিনি ১৯৬৫ সালে লিস্টারশায়ারের হয়ে নটিংহ্যামশায়ারের বিরুদ্ধে মাত্র ৮ মিনিটে ১৩ বলে ফিফটি করেছিলেন। আকাশ মাত্র এক মিনিটের ব্যবধানে শীর্ষস্থানটি মিস করলেও, বলের হিসেবে তিনি সবার সেরা।
ম্যাচের পরিস্থিতি ও মেঘালয়ের দাপট
আকাশ চৌধুরী ১৪ বলে ৫০ রান করে অপরাজিত থাকেন। ইনিংসের শেষ তিনটি বল তিনি ডট খেলেন, নাহলে তার স্ট্রাইক রেট আরও আকাশচুম্বী হতে পারত। মেঘালয় তাদের প্রথম ইনিংস ৬২৮ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে ডিক্লেয়ার করে। মেঘালয়ের রানের পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে অরুণাচল প্রদেশ তাদের প্রথম ইনিংসে মাত্র ৭৩ রানে গুটিয়ে যায়। আকাশ চৌধুরী বল হাতেও উজ্জ্বল ছিলেন এবং এক উইকেট তুলে নেন।
অরুণাচলকে ফলো-অন করতে বাধ্য করা হলে, দ্বিতীয় ইনিংসেও তারা বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। দিনের শেষে তাদের স্কোর দাঁড়ায় ৩ উইকেটে ২৯ রান। বল হাতেও আকাশ তার দক্ষতা দেখিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে আরও দুটি উইকেট সংগ্রহ করেন।
আকাশ চৌধুরীর ক্যারিয়ার ও সাম্প্রতিক ফর্ম
২৫ বছর বয়সী আকাশ চৌধুরীর এটি ছিল ৩১তম প্রথম শ্রেণির ম্যাচ। এই ম্যাচের আগে তার ব্যাটিং গড় ছিল ১৪.৩৭ এবং রান ছিল ৫০৩। তার ঝুলিতে এর আগে দুটি অর্ধশতরান ছিল। তবে এবারের ইনিংসটি তার ক্যারিয়ারকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল। আকাশ শুধু প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেই নয়, ২৮টি লিস্ট-এ এবং ৩০টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচও খেলেছেন।
বোলার হিসেবেও আকাশের পারফরম্যান্স বেশ সমীহ জাগানিয়া। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তিনি ৮৭টি উইকেট নিয়েছেন। লিস্ট-এ ক্রিকেটে তার উইকেটের সংখ্যা ৩৭ এবং টি-টোয়েন্টিতে ২৮। মজার ব্যাপার হলো, আকাশ যে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন তার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল আগের ম্যাচেও। বিহারের বিরুদ্ধে গত ম্যাচে তিনি ৬২ বলে ৬০ রান করার পথে ৪টি ছক্কা মেরেছিলেন।
উপসংহার
আকাশ চৌধুরীর এই পারফরম্যান্স ভারতীয় ঘরোয়া ক্রিকেটের মান এবং প্রতিভা সম্পর্কে আবারও বিশ্বকে জানান দিল। একজন লোয়ার-অর্ডার ব্যাটার যখন গ্যারি সোবার্স বা রবি শাস্ত্রীর মতো কিংবদন্তিদের রেকর্ডে ভাগ বসান, তখন তা বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। রঞ্জি ট্রফির ইতিহাসে আকাশের এই ১১ বলের ফিফটি এবং এক ওভারে ৬ ছক্কা চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ক্রিকেট প্রেমীরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবেন এই প্রতিভাবান অলরাউন্ডারের পরবর্তী পদক্ষেপ দেখার জন্য।
