রথেসে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপ ডিভিশন টু-তে অবশেষে তাদের বহু প্রতীক্ষিত প্রথম জয়ের স্বাদ পেল ডার্বিশায়ার। সেন্ট্রাল কো-অপ কাউন্টি গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচে একটি লড়াকু নর্দাম্পটনশায়ার দলকে ইনিংস ও ১১৩ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে তারা। ফাস্ট বোলার জ্যাক চ্যাপেল এবং ইংল্যান্ডের স্পিনার শোয়েব বশিরের অসাধারণ বোলিং পারফরম্যান্সের সুবাদে চতুর্থ দিনের শেষ লগ্নে এই জয় নিশ্চিত হয়। ডার্বিশায়ারের এই জয় দলটিকে মূল্যবান ২৩ পয়েন্ট এনে দিয়েছে, যেখানে পরাজিত নর্দাম্পটনশায়ারকে মাত্র ১ পয়েন্ট নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।
ডার্বিশায়ারের ব্যাটিং আধিপত্য
ম্যাচের শুরু থেকেই ডার্বিশায়ার তাদের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইন-আপের প্রদর্শন করে। প্রথম ইনিংসে তারা ৭ উইকেট হারিয়ে ৬০৪ রানের পাহাড়সমান স্কোর গড়ে ইনিংস ঘোষণা করে। এই ইনিংসে বেশ কয়েকজন ব্যাটসম্যান উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। হ্যারি গেস্ট ১৪১ রানের একটি দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন, যা দলের ভিত গড়ে দেয়। তার পাশাপাশি মার্টিন অ্যান্ডারসন ১০৬ রান করে শতকের ঘরে নাম লেখান। এছাড়া, জিউয়েল ৯৪, কেইম ৭৩, ম্যাডসেন ৫৯ এবং মন্টগোমারি ৫৪ রানের কার্যকরী ইনিংস খেলে দলকে বিশাল সংগ্রহ এনে দেন। ডার্বিশায়ারের এমন শক্তিশালী ব্যাটিং পারফরম্যান্স ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে তুলে দেয় এবং নর্দাম্পটনশায়ারের বোলারদের উপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করে। এই বিশাল স্কোর ডার্বিশায়ারকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায় এবং তাদের বোলারদের জন্য যথেষ্ট রানের গ্যারান্টি দেয়।
নর্দাম্পটনশায়ারের প্রথম ইনিংসের সংগ্রাম
ডার্বিশায়ারের বিশাল সংগ্রহের জবাবে নর্দাম্পটনশায়ার তাদের প্রথম ইনিংসে মাত্র ২২৮ রানে গুটিয়ে যায়। যদিও কেলভিন হ্যারিসন ১০৭ রানের একটি লড়াকু সেঞ্চুরি হাঁকান, দলের বাকি ব্যাটসম্যানরা বড় স্কোর করতে ব্যর্থ হন। ডার্বিশায়ারের বোলার বেন আইচিসন দুর্দান্ত বোলিং করে ৫৫ রানের বিনিময়ে ৪টি উইকেট শিকার করেন, যা নর্দাম্পটনশায়ারের ইনিংস ধসিয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখে। হ্যারিসনের একক প্রতিরোধ সত্ত্বেও, নর্দাম্পটনশায়ার ডার্বিশায়ারের বিশাল স্কোরের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি এবং ফলো-অনে পড়ে।
চতুর্থ দিনের নাটকীয় শুরু
ডার্বি শহরে সকালের দিকে বৃষ্টি হলেও, চতুর্থ দিনের খেলা নির্ধারিত সময়েই শুরু হয়। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ এবং ফ্লাডলাইটের আলো বোলিংয়ের জন্য চমৎকার পরিবেশ তৈরি করে। পিচে সিমারদের জন্য কিছুটা মুভমেন্ট ছিল, যা বোলারদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছিল। বেন আইচিসন দিনের পঞ্চম ওভারেই হ্যারি কনওয়ের (২০ মিনিট ক্রিজে থাকার পর) বাইরের এজ নিয়ে প্রথম আঘাত হানেন। নর্দাম্পটনশায়ারকে ফলো-অন এড়াতে অথবা অন্তত ম্যাচ বাঁচানোর জন্য দীর্ঘক্ষণ ব্যাটিং করতে হত, কিন্তু শুরুতেই উইকেট হারিয়ে তারা চাপে পড়ে যায়।
জ্যাক চ্যাপেল ও শোয়েব বশিরের সম্মিলিত আঘাত
নর্দাম্পটনশায়ারের ইনিংস বাঁচানোর আশায় কেলভিন হ্যারিসন প্রথম ইনিংসে পাঁচ ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যাট করেছিলেন এবং এই ইনিংসেও তিনি তার দলের প্রয়োজনীয় ধৈর্য্য দেখাচ্ছিলেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের স্পিনার শোয়েব বশির তার দ্বিতীয় ওভারে আঘাত হানেন। হ্যারিসন যখন সামনের দিকে ঠেলে খেলছিলেন, তখন বশিরের একটি বল টার্ন করে এবং স্লিপে থাকা ওয়েন ম্যাডসেন কোনো ভুল না করে তাকে ক্যাচ ধরে নেন। এটি নর্দাম্পটনশায়ারের ম্যাচ বাঁচানোর আশায় একটি বড় ধাক্কা ছিল।
পরের ওভারেই ডার্বিশায়ার আরও একটি আঘাত হানে। জ্যাক চ্যাপেল তার ডেলিভারিতে সাইফ জাইবকে আউট করেন। জাইব একটি ঢিলেঢালা শট খেলতে গিয়ে ক্যাচ আউট হন, যা ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় একটি দুর্বল শট ছিল। লাঞ্চের পর দ্বিতীয় ওভারে ডার্বিশায়ার আরেকটি উইকেট তুলে নেয় যখন জেমস সেলস বশিরের বলে একটি বড় শট খেলতে গিয়ে স্লিপে ম্যাডসেনের হাতে ক্যাচ দেন। এর ফলে ডার্বিশায়ার জয়ের কাছাকাছি চলে আসে।
লড়াকু জুটি: ম্যাকসুইনি ও বার্টলেট
নর্দাম্পটনশায়ারের ইনিংসকে রক্ষা করতে তখন একটি ভালো জুটির খুব প্রয়োজন ছিল। এই কঠিন সময়ে নাথান ম্যাকসুইনি এবং জর্জ বার্টলেট জুটি বাঁধেন। তারা দুজনেই অসাধারণ বোঝাপড়া দেখান এবং ২৫ ওভার ধরে ডার্বিশায়ারের বোলারদের হতাশ করে রাখেন। ম্যাকসুইনি ৬২ রান করার পথে একটি বেদনাদায়ক আঘাত পান এবং ৫০ রান করার পর একটি কঠিন ক্যাচ থেকে বেঁচে যান। তিনি প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে ক্রিজে টিকে ছিলেন, যা তার ধৈর্য ও প্রতিশ্রুতির প্রমাণ। বার্টলেটও তার পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন, অভিজ্ঞতার সাথে খেলেছেন এবং উইকেট ধরে রাখার উপর জোর দিয়েছেন। এই জুটি ডার্বিশায়ারের জয়ের পথে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, কারণ তারা সময় নষ্ট করছিল এবং পরাজয়কে বিলম্বিত করছিল।
চ্যাপেলের निर्णायक ব্রেকথ্রু
যখন মনে হচ্ছিল ম্যাকসুইনি ও বার্টলেটের জুটি ডার্বিশায়ারকে আরও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করাবে, ঠিক তখনই জ্যাক চ্যাপেল তার অভিজ্ঞতা ও গতি দিয়ে আবার আঘাত হানেন। চায়ের বিরতির তিন ওভার আগে তিনি ম্যাকসুইনিকে উইকেটকিপারের হাতে ক্যাচ দিতে বাধ্য করেন, যা ছিল ডার্বিশায়ারের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। এরপর চ্যাপেল দ্রুত আরও দুটি উইকেট তুলে নিয়ে ডার্বিশায়ারকে জয়ের দোরগোড়ায় নিয়ে আসেন। তিনি লুইস ম্যাকম্যানাসকে defensively খেলতে গিয়ে স্টাম্প আউট করেন এবং এরপর বেন স্যান্ডারসনকে এলবিডব্লিউ করে প্যাভিলিয়নে পাঠান। তার এই স্পেল নর্দাম্পটনশায়ারের মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়।
শেষ মুহূর্তের প্রতিরোধ এবং ডার্বিশায়ারের জয়
নর্দাম্পটনশায়ার তখনও সহজে হাল ছাড়তে রাজি ছিল না। জর্জ স্কির্মশ জর্জ বার্টলেটের সাথে জুটি বেঁধে ২০ ওভার ধরে ক্রিজে টিকে থাকেন, যা একটি অসাধারণ পালানোর আশা জাগিয়ে তোলে। বার্টলেট ১৭৫ বলে অপরাজিত ৬৫ রানের একটি ধৈর্যশীল ইনিংস খেলেন, যা তার দৃঢ় সংকল্পের প্রমাণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মার্টিন অ্যান্ডারসন একটি ফুল-লেংথ বলে স্কির্মশকে এলবিডব্লিউ করে এই প্রতিরোধ ভেঙে দেন। দিনের খেলা শেষ হতে মাত্র ১১ ওভার বাকি ছিল এবং এই উইকেটটি ডার্বিশায়ারের জয় নিশ্চিত করে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ডার্বিশায়ার তাদের মরসুমের প্রথম জয় উদযাপন করে। এই ম্যাচটি কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপের একটি দুর্দান্ত এবং রোমাঞ্চকর দিন উপহার দিয়েছে, যেখানে উভয় দলই জয়ের জন্য নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। ডার্বিশায়ারের বোলারদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং শেষ পর্যন্ত তাদের ধৈর্যই তাদের এই বিশাল জয় এনে দিয়েছে।
0 Comments