টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশের প্রত্যাহার: ‘সরকারের বড় ভুল’ বললেন সাকিব
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করা সরকারি ‘ভুল’ বলে মনে করেন সাকিব
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে ফেব্রুয়ারি-মার্চে অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ঘটনাটি একটি কালো অধ্যায় হয়ে থাকবে। এই টুর্নামেন্টে জাতীয় দলের অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তকে সরাসরি ‘ভুল’ বা ‘ব্লান্ডার’ বলে অভিহিত করেছেন অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত EUT20 বেলজিয়াম ইভেন্টের এক পার্শ্ব আলোচনায় তিনি তার এই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সাকিবের মতে, একটি ক্রিকেট পাগল দেশের জন্য বিশ্বকাপ মিস করা মানে অনেক বড় ক্ষতি। তিনি বলেন, “আমার মনে হয় এটি একটি বড় ক্ষতি ছিল। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি বিশাল মিস। আমরা এমন একটি দেশ যেখানে মানুষ তাদের খেলোয়াড়দের বিশ্বকাপে খেলতে দেখতে ভালোবাসে। আমার মনে হয় সরকারি পক্ষ থেকে এটি একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল যে তারা বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।”
উল্লেখ্য যে, ভারত সরকার এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা বলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতীয় দলকে ভারতে খেলতে যাওয়ার অনুমতি দেয়নি। এর ফলে আইসিসি বাংলাদেশকে সরিয়ে সেখানে স্কটল্যান্ডকে সুযোগ দেয়। ১৯৯৯ সালের পর এই প্রথম কোনো বিশ্বকাপে অংশ নিতে ব্যর্থ হলো বাংলাদেশ।
রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং আইপিএলের প্রভাব
এই পুরো সংকটের সূত্রপাত হয়েছিল যখন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতির প্রেক্ষাপটে বিসিসিআই অস্পষ্ট কারণে বাংলাদেশ ফাস্ট বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে সরিয়ে দেয়। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই বিশ্বকাপের আয়োজন চলছিল। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) অনুরোধ জানিয়েছিল যেন বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরিয়ে নেওয়া হয়, কিন্তু আইসিসি বোর্ড সেই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেয়।
এই সংকটের সময় প্রশাসনিক পর্যায়ে চরম অসামঞ্জস্য দেখা যায়। তৎকালীন ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল একাধিকবার বলেছিলেন যে, বিসিবি সরকারের আদেশ অনুযায়ী কাজ করেছে। তবে যখন বিশ্বকাপের তালিকা থেকে বাংলাদেশের বহিষ্কার নিশ্চিত হয়, তখন তিনি তার কথা থেকে পিছিয়ে যান এবং দাবি করেন যে বিসিবি স্বাধীনভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্য নিয়ে পরবর্তীতে ব্যাপক আলোচনা হয়।
বিসিসিআই-বিসিবি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ও বরফ গলানোর চেষ্টা
ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল ক্রিকেট বোর্ডে। তবে সাকিব আল হাসান আশাবাদী যে, দুই বোর্ডের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি হবে। বিশেষ করে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ভারত যদি বাংলাদেশে সাদা বলের সিরিজ খেলতে আসে, তবে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
সাকিব বলেন, “আমি মনে করি পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে। বিসিসিআই এবং বিসিবির মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালানো উচিত। বাংলাদেশ যদি ভারতে যায় অথবা ভারত যদি বাংলাদেশে আসে, তবে বরফ গলবে। আমি শুনেছি আগস্ট বা সেপ্টেম্বরে একটি সিরিজ হতে পারে, যা সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।”
তামিম ইকবালের বিসিবি সভাপতি হওয়া: নতুন দিগন্ত
সাকিবের দীর্ঘদিনের সতীর্থ তামিম ইকবালের বিসিবি সভাপতি হওয়া নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানান। ২০২৩ বিশ্বকাপের আগে সাকিবের নেতৃত্বাধীন দল থেকে তামিম বাদ পড়লে দুজনের মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই তিক্ততা ভুলে সাকিব তাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
সাকিব বলেন, “আমার মনে হয় সভাপতি হিসেবে তার একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা থাকবে। আশা করি বাংলাদেশ ক্রিকেট তার মাধ্যমে উপকৃত হবে।”
সাকিবের ব্যক্তিগত লড়াই এবং দেশে ফেরার স্বপ্ন
বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার হিসেবে পরিচিত সাকিব আল হাসান ২০২৪ সালের অক্টোবরের পর থেকে আর কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেননি। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি আর দেশে ফিরে আসেননি, কারণ তিনি ওই দলের একজন সংসদ সদস্য ছিলেন।
বর্তমানে তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলা বিচারাধীন। তবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রী আমিনুল হক জানিয়েছেন, সাকিব এবং মাশরাফ বিন মর্তুজার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে তারা আবারও বাংলাদেশ ক্রিকেটে অবদান রাখতে পারেন।
বিদায়বেলার স্বপ্ন: দেশের মাটিতে শেষ ম্যাচ
সাকিব আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার আগে দেশের মাটিতে একটি পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলার স্বপ্ন দেখছেন। প্রাক্তন ইংলিশ অলরাউন্ডার মোয়িন আলির একটি পডকাস্টে তিনি এর আগে জানিয়েছিলেন যে, তিনি তিন ফরম্যাটেই ম্যাচ খেলে বিদায় নিতে চান। বুধবার তাকে যখন ঢাকায় একটি বিদায় ম্যাচের কথা জিজ্ঞাসা করা হয়, তিনি বলেন, “আমি আশাবাদী যে আমি যা চাই তা পাব। আমার মনে হয় খুব শীঘ্রই সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।”
রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার মাঝেও সাকিব আল হাসানের মতো একজন কিংবদন্তির প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় থাকবে কোটি বাংলাদেশি ক্রিকেট అభిమాক।
