[CRK] সুজি বেটসের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর: এক কিংবদন্তির ২০ বছরের গৌরবময় যাত্রা
[CRK]
এক যুগের বেশি সময়ের রাজত্ব: সুজি বেটসের বিদায় ঘোষণা
বিশ্ব নারী ক্রিকেটের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং নিউজিল্যান্ডের অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার সুজি বেটস আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। ২০২৬ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পর তিনি মাঠ ছাড়বেন। দীর্ঘ ২০ বছরের এক দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘটবে এই বিশ্বকাপের মাধ্যমে, যা কেবল নিউজিল্যান্ডের জন্য নয়, বরং বিশ্ব নারী ক্রিকেটের জন্য এক বিশাল শূন্যতা তৈরি করবে।
সম্প্রতি কোয়াড্রিসেপস ইনজুরি থেকে ফিরে আসা এই তারকা ক্রিকেটার আগামী বুধবার তার প্রাক্তন স্কুল ‘ওটাগো গার্লস হাই স্কুলে’ একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে বিশ্বকাপের ১৫ সদস্যের দলে তার নাম ঘোষণা করা দেখবেন। এরপর মে মাসের শুরুতে তিনি নিউজিল্যান্ড দলের সাথে ইংল্যান্ড সফরে যাবেন, যেখানে ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ অনুষ্ঠিত হবে। বর্তমান defending চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নিউজিল্যান্ডের লক্ষ্য আবারও শিরোপা জেতা, আর সুজি বেটসের একমাত্র লক্ষ্য হলো তার ক্যারিয়ারের শেষ মিশনে এই জয় ছিনিয়ে আনা।
স্মৃতি এবং শেষ লক্ষ্য: একটি আবেগময় বিদায়
নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকিয়ে সুজি বেটস অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন। তিনি জানান, সময় কত দ্রুত চলে গেল তা তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। তাঁর ভাষায়, “গত ২০ বছরের দিকে তাকালে আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে সময় এত দ্রুত কেটে গেছে। আমি অনেকবার নিউজিল্যান্ডের প্রতীক ‘ফার্ন’ পরিধান করতে পেরে অত্যন্ত গর্বিত। প্রতিদিন একজন আরও ভালো মানুষ, ভালো সহকর্মী এবং একজন দক্ষ অ্যাথলেট হয়ে ওঠার চেষ্টা করা আমার জীবনের মূল লক্ষ্য ছিল এবং তা আমাকে অসীম আনন্দ দিয়েছে।”
ইংল্যান্ড তার জন্য সবসময়ই বিশেষ। অনেক মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই দেশটির সাথে। তাই তিনি তার শেষ মিশনে সেখানেই ফিরে যেতে চান। তিনি বলেন, “আমার একটি শেষ লক্ষ্য রয়েছে: যুক্তরাজ্যে যাওয়া এবং আরও একটি বিশ্বকাপ জয় করা। আমার শক্তির শেষ বিন্দুটি আমি এই শেষ লড়াইয়ে ব্যয় করতে চাই, যাতে আমার দল এমন ক্রিকেট খেলতে পারে যার জন্য আমরা এবং আমাদের দেশ গর্ববোধ করবে।”
পরিসংখ্যানের পাতায় এক অনন্য নাম
সুজি বেটসের ক্যারিয়ার কেবল আবেগের নয়, বরং অসামান্য সাফল্যের এক দীর্ঘ তালিকা। ২০০৩ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়সে ঘরোয়া ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে তার। এরপর ২০০৬ সালে তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পদার্পণ করেন। পরিসংখ্যানের দিক থেকে তিনি নারী ক্রিকেটের এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি:
- টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক: তিনি নারী টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক (৪৭১৭ রান)।
- ওয়ানডে আন্তর্জাতিক: নারী ওয়ানডে ক্রিকেটে তিনি চতুর্থ সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক (৫৯৬৪ রান)।
- নেতৃত্ব: ২০১১ সালের জুলাই মাসে তিনি নিউজিল্যান্ড দলের অধিনায়ক নিযুক্ত হন এবং দীর্ঘ সাত বছর দলকে নেতৃত্ব দেন।
- স্বীকৃতি: ২০১৬ সালে বিশ্ববিখ্যাত ‘উইজডেন’ তাকে বিশ্বের সেরা নারী ক্রিকেটার হিসেবে ঘোষণা করেছিল।
ক্রিকেটের বাইরেও এক বহুমুখী প্রতিভার পরিচয়
সুজি বেটসের অ্যাথলেটিসিজম কেবল ক্রিকেট মাঠেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি নিউজিল্যান্ডের বাস্কেটবল দল ‘টল ফার্নস’-এর হয়ে ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করেছিলেন। একজন অ্যাথলেট হিসেবে তার এই বহুমুখী দক্ষতা এবং পরিশ্রম করার ক্ষমতা তাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল, যা পরবর্তী প্রজন্মের নারী খেলোয়াড়দের জন্য এক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
সহকর্মীদের শ্রদ্ধা এবং শেষ কথা
নিউজিল্যান্ডের বর্তমান অধিনায়ক অ্যামেলিয়া কার সুজি বেটসের কথা বলে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি তাকে বর্ণনা করেন “সর্বকালের অন্যতম সেরা ক্রিকেটার” হিসেবে। অ্যামেলিয়া বলেন, “ছোটবেলায় সুজি ছিলেন আমার রোল মডেল। আমি অত্যন্ত ভাগ্যবান যে তিনি যখন অধিনায়ক ছিলেন, তখন আমি দলে সুযোগ পেয়েছিলাম। যারা তার সাথে খেলেছেন, তারা জানেন যে তিনি বিশ্বের অন্যতম নিঃস্বার্থ ক্রিকেটার এবং সেরা সহকর্মী। তার রেকর্ড নিজেই কথা বলে। নিউজিল্যান্ডের নারী খেলাধুলায় তিনি যে পথ তৈরি করে দিয়ে গেছেন, তার জন্য তার গর্বিত হওয়া উচিত। হোয়াইট ফার্নস পরিবার তাকে ভীষণ মিস করবে।”
এনজেডসি-র উইমেন’স হাই পারফরম্যান্স ডেভেলপমেন্ট প্রধান লিজ গ্রিনও সুজির অবদানের কথা উল্লেখ করে বলেন, তার অবদান ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। লিজের মতে, সুজি বেটসের মতো খেলোয়াড়দের কারণেই নারী ক্রিকেট আজকের এই অবস্থানে পৌঁছেছে। মাঠের পারফরম্যান্সের বাইরেও একজন মানুষ এবং মেন্টর হিসেবে তিনি বিশ্বজুড়ে অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন।
বিদায়বেলায় সুজি তার পরিবার, তার সঙ্গী স্কটি এবং তার ছেলেদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন, যারা তার জীবনের সব উত্থান-পতনে পাশে ছিলেন। পাশাপাশি তিনি সেইসব কোচ এবং কর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, যারা অনেক বছর ধরে খুব সামান্য স্বীকৃতি বা পুরস্কার পাওয়ার সত্ত্বেও নারী ক্রিকেটের উন্নয়নে নিরলস কাজ করে গেছেন।
সুজি বেটস হয়তো মাঠ ছাড়ছেন, কিন্তু তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার এবং অনুপ্রেরণা নিউজিল্যান্ড এবং বিশ্ব নারী ক্রিকেটের ইতিহাসে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।
