[CRK] আবরার ও আয়ুবের ঝলকে দক্ষিণ আফ্রিকাকে হারিয়ে সিরিজ জিতল পাকিস্তান
[CRK]
ফয়সালাবাদের ধীরগতির এবং নিচু উইকেটে আবরার আহমেদ ও সাইম আয়ুবের অনবদ্য পারফরম্যান্সে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৭ উইকেটে পরাজিত করে ওডিআই সিরিজ ৩-০ ব্যবধানে জিতে নিলো পাকিস্তান। এটি প্রোটিয়াদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের টানা তৃতীয় ওয়ানডে সিরিজ জয়, যা তাদের সাম্প্রতিক ফর্মের ধারাবাহিকতার প্রমাণ। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ প্রথম থেকেই পাকিস্তানের হাতে ছিল এবং তারা একপেশেভাবে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে সিরিজ নিজেদের করে নেয়।
প্রথমে ব্যাট করতে নেমে দক্ষিণ আফ্রিকা মাত্র ১৪৩ রানে গুটিয়ে যায়। জবাবে পাকিস্তান মাত্র তিন উইকেট হারিয়ে ১৪৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করে ফেলে, হাতে ছিল প্রায় ২৫ ওভার। এই জয়ে আবরার আহমেদের ক্যারিয়ার সেরা ৪ উইকেটের স্পেল এবং সাইম আয়ুবের অপরাজিত ৭৭ রানের ইনিংস ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আবরারের ঘূর্ণিতে দিশেহারা দক্ষিণ আফ্রিকা
দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমে ব্যাট করতে নেমে কুইন্টন ডি কক এবং লহুয়ান-দ্রে প্রিটোরিয়াসের ব্যাটে শক্তিশালী সূচনা করে। উদ্বোধনী জুটিতে তারা ৭২ রান যোগ করেন এবং এক পর্যায়ে তাদের স্কোর ছিল ২ উইকেটে ১০৬ রান। কিন্তু এর পরেই দৃশ্যপটে আবির্ভূত হন আবরার আহমেদ। তার স্পিন ঘূর্ণিতে দক্ষিণ আফ্রিকার মিডল অর্ডার ভেঙে পড়ে। মাত্র দুই ওভারের মধ্যে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে তিনি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন।
আবরার আহমেদের শিকারের তালিকায় ছিলেন রুবিন হারমান, ডোনোভান ফেরেইরা এবং করবিন বোশ। অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামা রুবিন হারমান গুগলি বুঝতে না পেরে বোল্ড হন। ডোনোভান ফেরেইরা সুইপ করতে গিয়ে বল মিস করেন এবং লেগ স্টাম্প উন্মোচন করে বোল্ড হন। আর করবিন বোশ প্রথম বলেই নিচু বাউন্সের শিকার হয়ে বোল্ড হন। হ্যাটট্রিক না পেলেও, আবরার তার শেষ ওভারে ব্রীটজকে উইকেটকিপারের হাতে ক্যাচ দিতে বাধ্য করে দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসের দ্রুত পরিসমাপ্তি ঘটান। সব মিলিয়ে আবরার আহমেদ ৪ উইকেট নেন মাত্র ২৭ রানের বিনিময়ে, যা তার ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সেরা বোলিং পারফরম্যান্স। শাহিন শাহ আফ্রিদি এবং সালমান আগা প্রত্যেকে দুটি করে উইকেট নিয়ে আবরারকে যোগ্য সঙ্গ দেন।
ডি ককের মাইলফলক ও প্রোটিয়াদের পতন
দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংসে একমাত্র উজ্জ্বল দিক ছিলেন অভিজ্ঞ ওপেনার কুইন্টন ডি কক। তিনি দলের হয়ে ৫৩ রান করেন এবং ওডিআইতে ৭০০০ রান পূর্ণ করেন। স্বদেশী হাশিম আমলার পর দ্বিতীয় দ্রুততম ব্যাটসম্যান হিসেবে তিনি এই মাইলফলক স্পর্শ করেন, যা করতে তার লেগেছে ১৫৮ ইনিংস। মোহাম্মদ নওয়াজকে রিভার্স সুইপ করে চার মেরে তিনি তার অর্ধশতক পূর্ণ করেন। তবে পরের দুই বল পরেই তিনি একই স্পিনারের বলে স্লগ সুইপ করতে গিয়ে এলবিডব্লিউর শিকার হন। ডি কক যখন ক্রিজে ছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা একটি বড় স্কোর গড়তে পারবে, কিন্তু তার বিদায়ের পর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে প্রোটিয়ারা।
শাহিন শাহ আফ্রিদি এবং হারিস রউফ, যিনি দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে দলে ফিরেছিলেন, শুরুতে কিছুটা খরুচে বোলিং করলেও পরে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে উইকেট তুলে নেন। বিশেষ করে আফ্রিদি তার স্লোয়ার বলে ডি কককে বেশ ভুগিয়েছিলেন। প্রিটোরিয়াস ৩৯ রান করে সালমান আগার বলে লং-অফে ক্যাচ দিয়ে আউট হন। টনি ডি জর্জি দ্রুতই এক্সট্রা কভারে ক্যাচ তুলে দেন। শেষ পর্যন্ত, দক্ষিণ আফ্রিকা মাত্র ৩৭.৫ ওভারে ১৪৩ রানে অলআউট হয়ে যায়, যা ফয়সালাবাদের উইকেটে মোটেই একটি চ্যালেঞ্জিং স্কোর ছিল না।
সাইম আয়ুবের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে পাকিস্তানের সহজ জয়
১৪৪ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে পাকিস্তানের শুরুটা অবশ্য মসৃণ ছিল না। নন্দ্রে বার্গার টানা দ্বিতীয় ম্যাচে ফখর জামানকে শূন্য রানে আউট করেন। বার্গার দুই দিকেই বল সুইং করাচ্ছিলেন এবং পাকিস্তানকে প্রথম রান সংগ্রহ করতে ১৪ বল অপেক্ষা করতে হয়েছিল। সাইম আয়ুব এবং তিন নম্বরে নামা বাবর আজম উভয়েই শুরুতে সতর্ক ছিলেন। আয়ুব নিজে তার রানের খাতা খুলতে ১০ বল নিয়েছিলেন।
তবে একবার যখন তিনি রানের দেখা পেলেন, তখন আর তাকে আটকানো সম্ভব হয়নি। বার্গারের একটি লেন্থ বলকে কভারের উপর দিয়ে চার মেরে তিনি রানের স্রোত খুলে দেন। এরপরের পাঁচ ওভারেই পাকিস্তান আটটি চার এবং দুটি ছক্কা হাঁকায়। দশ ওভারের মধ্যে পাকিস্তানের স্কোর দাঁড়ায় ১ উইকেটে ৫৯ রান। বাবর আজম ২৭ রান করে তৃতীয় রান নিতে গিয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে রান আউট হন। কিন্তু সাইম আয়ুব ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। যদিও তার প্রতিটি শটই নিয়ন্ত্রিত ছিল না, তবুও তিনি সেগুলো খেলতে দ্বিধা করেননি। প্রায়শই তিনি উপরের দিক দিয়ে শট খেলেছেন এবং মাত্র ৩৯ বলে নিজের অর্ধশতক পূর্ণ করেন। তার এই ঝড়ো ইনিংস পাকিস্তানকে একটি আরামদায়ক জয়ের দিকে নিয়ে যায়। মোহাম্মদ রিজওয়ান (৩২*) অপরাজিত থেকে আয়ুবকে যোগ্য সঙ্গ দেন এবং তারা দলকে ৭ উইকেটের এক বিশাল জয় এনে দেন, যা প্রায় ২৫ ওভার হাতে রেখেই সম্পন্ন হয়।
এই সিরিজ জয় পাকিস্তানের জন্য একটি বড় আত্মবিশ্বাসের উৎস হবে। বিশেষ করে তরুণ স্পিনার আবরার আহমেদ এবং ওপেনার সাইম আয়ুবের পারফরম্যান্স দলের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। দক্ষিণ আফ্রিকার জন্য এই সিরিজ একটি হতাশাজনক অভিজ্ঞতা, যেখানে তারা ব্যাট ও বল উভয় বিভাগেই পাকিস্তানের কাছে পরাস্ত হয়েছে। ফয়সালাবাদের এই জয় পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে একটি স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
