ভারতীয় ক্রিকেটের মোড় ঘোরানো অধ্যায় ও সৌরভ গাঙ্গুলীর স্মৃতিচারণ
২০০০ সালের সেই উত্তাল সময়ের কথা ভাবলে আজও অনেক ক্রিকেট প্রেমীর মনে শিহরণ জাগে। ভারতীয় ক্রিকেট তখন এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের কালো ছায়া গ্রাস করেছিল মাঠের পারফরম্যান্সকে। ঠিক সেই মুহূর্তে ভারতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন সৌরভ গাঙ্গুলী। তবে অধিনায়কত্বের শুরুর দিনগুলো যে কতটা কঠিন ছিল এবং পর্দার আড়ালে কী কী ঘটেছিল, তা নিয়ে সম্প্রতি এক পডকাস্টে মুখ খুলেছেন ‘মহারাজ’ স্বয়ং। রাজ শমানির পডকাস্টে তিনি জানিয়েছেন, সেই সময় দলের সিনিয়র খেলোয়াড়দের প্রতি তার অগাধ আস্থা থাকলেও মনের কোণে উঁকি দিচ্ছিল কিছু অজানা প্রশ্ন।
ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারি ও আস্থার সংকট
২০০০ সালের শুরুর দিকে ভারতীয় ক্রিকেট এক বিশাল ধাক্কার সম্মুখীন হয়। মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন এবং অজয় জাদেজার মতো তারকা খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের অভিযোগ ওঠে। এর ফলে আজহারউদ্দিনকে আজীবন এবং অজয় জাদেজাকে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়। এই ঘটনাটি শুধুমাত্র খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ারই শেষ করেনি, বরং সাধারণ দর্শকদের মনেও গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল। সামান্যতম পরাজয়েও ভক্তরা ফাউল প্লে-র সন্দেহ করতে শুরু করেছিলেন। ক্রিকেটের প্রতি মানুষের বিশ্বাস যখন তলানিতে, ঠিক তখনই ‘প্রিন্স অফ কলকাতা’ হিসেবে পরিচিত সৌরভ গাঙ্গুলীর হাতে তুলে দেওয়া হয় নেতৃত্বের ব্যাটন।
শচীন ও দ্রাবিড়কে করা সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
সৌরভ গাঙ্গুলী প্রকাশ করেছেন যে, অধিনায়ক হওয়ার ঠিক আগে বা পরে তিনি নিজেও জানতেন না ম্যাচ ফিক্সিং আসলে কীভাবে ঘটে। তিনি নিজেই এই বিষয়ে কিছুটা বিভ্রান্ত ছিলেন কারণ তাকে ব্যক্তিগতভাবে কেউ কখনও কোনো অনৈতিক প্রস্তাব দেয়নি। সৌরভ বলেন, ‘ভারতীয় দল যখন এই সংকটের মুখোমুখি হয়েছিল, আমি জানতামই না এগুলো আসলে কী। আমি শচীন (তেন্ডুলকর) এবং রাহুলকে (দ্রাবিড়) বারবার জিজ্ঞেস করতাম—সত্যিই কি এমন কিছু ঘটে? তোমাদের কি কেউ কখনো কোনো প্রস্তাব দিয়েছে? কারণ আমার কাছে এমন কেউ আসেনি।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমি শচীনকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোকে কি কেউ কখনও কিছু জিজ্ঞেস করেছে? ও বলেছিল—না। অনিল কুম্বলেকেও জিজ্ঞেস করেছিলাম, ও বলেছিল—না, আমাকেও কেউ কিছু বলেনি। তাই আমি আসলে নিশ্চিত ছিলাম না বিষয়টা ঠিক কী। আমার কাছে অধিনায়কত্ব ছিল স্রেফ একটা দায়িত্ব, ম্যাচ ফিক্সিং নিয়ে আমি খুব বেশি মাথা ঘামাইনি কারণ আমার ফোকাস ছিল খেলায়।’ এই সততা এবং পারস্পরিক আস্থাই পরবর্তীকালে ভারতীয় দলকে একতাবদ্ধ করতে সাহায্য করেছিল।
সিনিয়রদের সামলানোর চ্যালেঞ্জ ও প্রথম মিটিং
২৭ বছর বয়সে যখন সৌরভ দায়িত্ব নেন, তখন দলে ছিলেন শচীন তেন্ডুলকর, অনিল কুম্বলে এবং জাভাগাল শ্রীনাথের মতো তারকারা, যারা সৌরভের আগে ভারতীয় দলের অধিনায়কত্ব করেছেন বা অনেক বেশি অভিজ্ঞ ছিলেন। সৌরভ স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমার মনে আছে কোচিতে আমাদের প্রথম ম্যাচ ছিল। ম্যাচের আগের রাতে আমাকে টিম মিটিংয়ে ভাষণ দিতে হয়েছিল। আমি ডোনাকে (সৌরভের স্ত্রী) বলেছিলাম, আজহার বা শচীনের মতো খেলোয়াড়রা আমার অধিনায়ক ছিল। আমি তাদের কীভাবে বলব যে কী করতে হবে আর কী নয়?’
তিনি আরও জানান যে, সেই মিটিংটি তিনি খুব সংক্ষিপ্ত রেখেছিলেন। সৌরভের কথায়, ‘আমি ডোনাকে বলেছিলাম মিটিং যত লম্বা হবে, আমাকে তত বেশি কথা বলতে হবে। তাই আমি ১৫ মিনিটের মধ্যে মিটিং শেষ করে ফেলি এবং খুব নির্দিষ্ট কিছু কথা বলি। পরের দিন আমরা ম্যাচে জয়ী হই। তার পরের ম্যাচে জামশেদপুরে আমি সেঞ্চুরি করি। এভাবেই ধীরে ধীরে সবকিছু ঠিক হতে শুরু করে।’
সৌরভের নেতৃত্বে ভারতীয় ক্রিকেটের সোনালী সময়
সৌরভ গাঙ্গুলীর নেতৃত্ব শুধুমাত্র দলকে একতাবদ্ধ করেনি, বরং বিদেশের মাটিতে জয়ের মানসিকতা তৈরি করেছিল। তার ৫ বছরের অধিনায়কত্বে ভারত ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে নাটওয়েস্ট ট্রফি জয় করে এবং আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে যুগ্ম বিজয়ী হয়। সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল ১৯৮৩ সালের পর প্রথমবারের মতো ২০০৩ বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছানো। তার নেতৃত্বেই ভারত অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলকে ঘরের মাঠে হারায় এবং পাকিস্তানে গিয়ে টেস্ট সিরিজ জয়ের ইতিহাস গড়ে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কারিগর
সৌরভ গাঙ্গুলীর অবদান কেবল ট্রফিতেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ভারতীয় ক্রিকেটকে এমন কিছু প্রতিভা উপহার দিয়েছেন যারা পরবর্তী এক দশক বিশ্ব ক্রিকেট শাসন করেছেন। বীরেন্দ্র সেহওয়াগ, যুবরাজ সিং, এমএস ধোনি, জহির খান এবং হরভজন সিং-এর মতো খেলোয়াড়দের ওপর সৌরভ যে আস্থা দেখিয়েছিলেন, তা আজও প্রশংসিত হয়। ম্যাচ ফিক্সিংয়ের কলঙ্ক মুছে ভারতীয় ক্রিকেটকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার কারিগর হিসেবে সৌরভ গাঙ্গুলীর নাম ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তার হাত ধরেই ভারতীয় ক্রিকেট এক অন্ধকার যুগ থেকে বেরিয়ে আলোর পথে পা বাড়িয়েছিল।
0 Comments