অস্ট্রেলিয়ার আধিপত্যের সূচনা এবং ২০১০-এর সেই রোমাঞ্চকর ফাইনাল
ক্রিকেট বিশ্বের কাছে অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ জয়ের রহস্য আজও এক অমীমাংসিত ধাঁধা। বছরের পর বছর ধরে তারা যেভাবে বিশ্ব আসরে আধিপত্য বিস্তার করে চলেছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর। তাদের দলে প্রতিভার অভাব কখনওই ছিল না, কিন্তু সেই সাথে এক অদৃশ্য সৌভাগ্য যেন তাদের সঙ্গী হয়, যা নারী ও পুরুষ উভয় দলকেই অপরাজেয় করে তোলে।

অস্ট্রেলীয় পুরুষ দলের বিশ্বজয়ের দীর্ঘ ইতিহাসের পাশাপাশি ২০১০ সালের নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনাল আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে অম্লান। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচে কিউই নারীরা জয়ের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিল, কিন্তু এলিস পেরির এক অসামান্য ‘কিক’ তাদের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল।
নিউজিল্যান্ডের হাতছানি এবং অজিদের বিপর্যয়
ক্রিকেট বিশ্বে অস্ট্রেলিয়া বরাবরই এক বিশাল শক্তি। ২০১০ সালের নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও তারা ফেভারিট ছিল। কিন্তু ফাইনালের মঞ্চে তারা এক অদ্ভুত দুর্বলতার পরিচয় দেয়। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে শিরোপা লড়াইয়ের শুরুতে অজিদের ব্যাটিং লাইনআপ যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল। মাত্র ২০ রানের মধ্যেই তারা ৩ উইকেট হারিয়ে বিপর্যয়ে পড়ে। লিয়া পল্টনের ২৮ বলে ২০ রান ছাড়া আর কেউ তেমন প্রতিরোধ গড়তে পারেননি, ফলে অস্ট্রেলিয়া মাত্র ১০৬ রানেই তাদের ইনিংস শেষ করতে বাধ্য হয়।
নিউজিল্যান্ডের সামনে জয়ের লক্ষ্য ছিল ১০৭ রান। প্রথমবার বিশ্বজয়ের স্বাদ পেতে মুখিয়ে থাকা কিউই নারীরা তখন ইতিহাসের খুব কাছে। কিন্তু বড় ম্যাচের চাপ যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা নিউজিল্যান্ডের ইনিংসের মধ্যভাগে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাদের ব্যাটাররা একের পর এক উইকেট হারিয়ে চাপের মুখে নুয়ে পড়েছিলেন।
শেষ ওভারের নাটকীয়তা ও পেরির জাদুকরী বুট
ম্যাচের মোড় তখন বারবার ঘুরছে। শেষ ওভারে নিউজিল্যান্ডের জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৪ রান। অধিনায়ক এলিস পেরির ওপর ভরসা রেখেছিলেন। আর সেই সিদ্ধান্তটিই হয়ে ওঠে ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। শেষ বলে নিউজিল্যান্ডের প্রয়োজন ছিল ৫ রান। পেরি ফুলার লেংথের একটি বল করেন, যা সোফি ডিভাইন সজোরে সোজা ব্যাটে ড্রাইভ করেন। কিউই ডাগআউটে তখন উদযাপনের প্রস্তুতি চলছে, কিন্তু ঠিক তখনই ঘটে এক অভাবনীয় ঘটনা।
বল যখন মাঠের বাইরে যাওয়ার পথে, পেরি সহজাত ভঙ্গিতে তার ডান পা বাড়িয়ে দেন। তার বুটের স্পর্শে বলের গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে মিড-উইকেটের দিকে চলে যায়। যেখানে একটি নিশ্চিত বাউন্ডারি হওয়ার কথা ছিল, সেখানে মাত্র এক রান নিতে সক্ষম হন ব্যাটাররা। এই ঘটনার মাধ্যমেই অস্ট্রেলিয়া তিন রানের ব্যবধানে জয়লাভ করে তাদের প্রথম নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা উঁচিয়ে ধরে।
বিতর্ক থেকে কিংবদন্তি: এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত
লো-স্কোরিং এই থ্রিলার ম্যাচটি এমনিতেই স্নায়ুচাপে ভরা ছিল, কিন্তু এলিস পেরির সেই বিতর্কিত ও নাটকীয় ‘কিক’ বিষয়টিকে অমরত্ব দান করেছে। ম্যাচ শেষে এই ডিফলেকশন নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হলেও, এটিই ছিল অজিদের বিশ্বজয়ের মহাকাব্যের প্রথম অধ্যায়। এই জয়ের মাধ্যমেই অস্ট্রেলিয়া নারী ক্রিকেট দল এক অপরাজেয় যুগের সূচনা করে। পরবর্তী সময়ে তারা রেকর্ড ছয়বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছে।
ক্রিকেট ইতিহাসে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যা বারবার ফিরে দেখা হয়। কিন্তু এলিস পেরির সেই ‘কিক অফ ডেসটিনি’ কেবল একটি জয় নয়, বরং নারী ক্রিকেটের ইতিহাসে এক কিংবদন্তি মুহূর্ত হিসেবে টিকে থাকবে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, খেলার মাঠে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান গড়ে দেওয়ার জন্য অনেক সময় এক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত বা সামান্য একটি স্পর্শই যথেষ্ট।
0 Comments