আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উত্থানের অনন্য গল্প
ক্রিকেট বিশ্বে সাধারণত দেখা যায়, আইসিসির ফুল মেম্বার বা টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর খেলোয়াড়রা ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে বা সুযোগের সন্ধানে অ্যাসোসিয়েট দেশগুলোর হয়ে খেলছেন। কিন্তু এই স্রোতের বিপরীতে গিয়ে খুব কম খেলোয়াড়ই অ্যাসোসিয়েট নেশন থেকে উঠে এসে বিশ্বমঞ্চে বড় কোনো দলের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। এমন একটি সুযোগ পাওয়া মানেই ওই খেলোয়াড়ের অসাধারণ প্রতিভা ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের প্রমাণ। সম্প্রতি এমিলিও গে-এর ইংল্যান্ড দলে অন্তর্ভুক্তির খবরটি আবারও এই বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে। আজকের নিবন্ধে আমরা এমন পাঁচজন ক্রিকেটারকে নিয়ে আলোচনা করব, যারা এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন।
১. ইয়ন মর্গান (আয়ারল্যান্ড থেকে ইংল্যান্ড)
অ্যাসোসিয়েট দেশ থেকে এসে ফুল মেম্বার দলে জায়গা করে নেওয়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলেন ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ইয়ন মর্গান। ২০০৬ সালে আয়ারল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেন তিনি। ২০০৯ সাল পর্যন্ত আয়ারল্যান্ডের হয়ে ২৩টি ওয়ানডে খেলে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। আয়ারল্যান্ডের হয়ে একটি সেঞ্চুরি ও পাঁচটি ফিফটির পর তিনি ইংল্যান্ডের ডাক পান। ইংল্যান্ডের জার্সিতে তিনি ৩৫৬টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে ১০ হাজারেরও বেশি রান করেছেন। তার নেতৃত্বে ২০১৯ সালে ইংল্যান্ড প্রথমবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতে, যা তাকে ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সফল অধিনায়কে পরিণত করেছে।
২. ডার্ক ন্যানেস (নেদারল্যান্ডস থেকে অস্ট্রেলিয়া)
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত গতি ও সুইংয়ের জন্য পরিচিত ডার্ক ন্যানেস ছিলেন একসময়ের ত্রাস। ২০০৯ সালে নেদারল্যান্ডসের হয়ে নিজের যাত্রা শুরু করলেও তার বিধ্বংসী বোলিং দ্রুতই অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচকদের নজরে আসে। ২০০৯ সালেই তিনি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলার সুযোগ পান। ২০১০ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে ফাইনালে তোলার পেছনে তার বড় অবদান ছিল, যেখানে তিনি আসরের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি ছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে ১৫টি টি-টোয়েন্টি খেলে ২৭টি উইকেট নিয়েছেন এই পেসার।
৩. টিম ডেভিড (সিঙ্গাপুর থেকে অস্ট্রেলিয়া)
বর্তমান টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের অন্যতম বিধ্বংসী ব্যাটার টিম ডেভিড। তবে তার উত্থান হয়েছিল সিঙ্গাপুর জাতীয় দলের হয়ে। ২০১৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত সিঙ্গাপুরের হয়ে ১৪ ইনিংসে ১৫৮.৫২ স্ট্রাইক রেটে ৫৫৮ রান করে তিনি বিশ্বকে নিজের সামর্থ্যের জানান দিয়েছিলেন। ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়া দলে ডাক পাওয়ার পর থেকেই তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম বড় তারকা হয়ে ওঠেন। অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে ৫৭টি টি-টোয়েন্টি খেলে ১০৪৪ রান করেছেন, যার মধ্যে রয়েছে পাঁচটি ফিফটি ও একটি সেঞ্চুরি।
৪. মার্ক চ্যাপম্যান (হংকং থেকে নিউজিল্যান্ড)
নিউজিল্যান্ডের সাদা বলের ক্রিকেটে নিয়মিত মুখ মার্ক চ্যাপম্যান। বর্তমানে কিউইদের মিডল অর্ডারে তিনি এক আস্থার নাম। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার অভিষেক হয়েছিল হংকংয়ের হয়ে। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি হংকংয়ের হয়ে ৩২টি টি-টোয়েন্টি ও দুটি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেন। ২০১৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে হংকংয়ের জার্সি গায়ে তার পারফরম্যান্স নিউজিল্যান্ডের নির্বাচকদের মুগ্ধ করে। এখন পর্যন্ত ব্ল্যাকক্যাপসদের হয়ে তিনি ১০০টিরও বেশি ম্যাচ খেলেছেন এবং তিন সেঞ্চুরিসহ ২৪০০-এর বেশি রান সংগ্রহ করেছেন।
৫. এমিলিও গে (ইতালি থেকে ইংল্যান্ড)
এই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন হলেন এমিলিও গে। ইতালির হয়ে তিনটি টি-টোয়েন্টি খেলার পর, ২০২৬ সালে ইংল্যান্ডের টেস্ট দলে তার ডাক পাওয়াটা এক রূপকথার মতো। কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে ডারহামের হয়ে দুর্দান্ত ব্যাটিং ফর্মে থাকা এমিলিও গে চলতি মৌসুমে ৫ ম্যাচে ৫৫২ রান করেছেন। তার এই অসাধারণ ধারাবাহিকতা তাকে ইংল্যান্ডের টেস্ট দলের টপ অর্ডারের শূন্যতা পূরণের প্রধান দাবিদার করে তুলেছে।
উপসংহার
এই ক্রিকেটারদের গল্প থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, প্রতিভা ও কঠোর পরিশ্রম থাকলে যেকোনো জায়গা থেকেই বিশ্ব ক্রিকেটের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। অ্যাসোসিয়েট দেশগুলো এখন আর কেবল উন্নতির অপেক্ষায় থাকা দল নয়, বরং তারা বিশ্বমানের ক্রিকেটার তৈরির কারখানাতেও পরিণত হচ্ছে। এমিলিও গে বা টিম ডেভিডদের মতো খেলোয়াড়রা প্রমাণ করেছেন যে, সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারলে গণ্ডি পেরিয়ে বড় মঞ্চে নিজেদের প্রমাণ করা কেবল সময়ের ব্যাপার।
0 Comments