রাজনীতিকে বিদায় জানালেন মনোজ তিওয়ারি
ভারতের প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী মনোজ তিওয়ারি তার পাঁচ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন। সোমবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর তিনি এই ঘোষণা করেন। ২০২১ সালে তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) টিকিটে শিবপুর কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে তিনি রাজ্য সরকারের ক্রীড়া ও যুবকল্যাণ দপ্তরের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তবে তার পাঁচ বছরের এই যাত্রা যে মোটেও মসৃণ ছিল না, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
টিএমসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিস্ফোরক অভিযোগ
পিটিআই-এর সাথে এক সাক্ষাৎকারে মনোজ তিওয়ারি যে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এনেছেন, তা বাংলার রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন যে, তাকে বিধায়ক হওয়ার টিকিট দেওয়ার বিনিময়ে ৫ কোটি টাকা দাবি করা হয়েছিল। মনোজ তিওয়ারির ভাষায়, ‘এই পরাজয় আমার কাছে মোটেও আশ্চর্যজনক নয়। এটি হওয়ারই ছিল কারণ এলাকায় কোনো উন্নয়ন হয়নি এবং দলটি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। আমাকে টিকিট পাওয়ার জন্য ৫ কোটি টাকা দিতে বলা হয়েছিল, কিন্তু আমি তা প্রত্যাখ্যান করি।’
তিনি আরও যোগ করেন যে, অন্তত ৭০-৭২ জন ব্যক্তি সেই টাকা দিয়ে টিকিট কিনেছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন জয়ী হতে পেরেছেন, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি। এই অভিজ্ঞতার পর তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, রাজনীতি এখন তার কাছে একটি অতীত অধ্যায়।
নিজের পকেট থেকে ব্যয় করেছেন উন্নয়নের অর্থ
একজন বিধায়ক হিসেবে নিজের কেন্দ্রের সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে গিয়ে তাকে চরম হতাশার মুখে পড়তে হয়েছিল বলে জানিয়েছেন প্রাক্তন এই আইপিএল বিজয়ী। মনোজ তিওয়ারি বলেন, ‘বিধায়ক হওয়ার পরও আমার এলাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য আমাকে বারবার দৌড়ঝাঁপ করতে হয়েছে। কিন্তু কেউ গুরুত্ব দেয়নি। অনেক ক্ষেত্রে আমি নিজের পকেট থেকে টাকা দিয়ে কাজ করিয়েছি।’
তিনি অভিযোগ করেন যে, মুখ্যমন্ত্রী প্রতি বছর ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার কিছুই হয়নি। উন্নয়নমূলক কাজগুলো পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
ক্রীড়া দপ্তরের অন্দরমহল ও অরূপ বিশ্বাস
সাবেক এই ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের কর্মপদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। মনোজের দাবি, অরূপ বিশ্বাস খেলার বিষয়ে খুব একটা জ্ঞান রাখেন না। অনেক অনুষ্ঠানেই তাকে আমন্ত্রণ জানানো হতো না, যা ছিল অপমানজনক। এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বই তাকে দলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল।
লিওনেল মেসির কলকাতা সফর ও মনোজ
লিওনেল মেসির কলকাতা সফর নিয়েও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন মনোজ। তিনি জানান, সেই অনুষ্ঠানে তিনি ইচ্ছে করেই উপস্থিত ছিলেন না। তার কথায়, ‘আমি জানতাম কিছু একটা ঘটনা ঘটবে। সাধারণ মানুষকে বোকা বানানো হচ্ছিল, আর আমি সেই সার্কাসের অংশ হতে চাইনি।’
সামগ্রিক মূল্যায়ন
মনোজ তিওয়ারির এই সাক্ষাৎকার স্পষ্ট করে দেয় যে, তিনি আদর্শগতভাবে দলে কাজ করতে গিয়ে কতটা বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। একজন ক্রিকেটার হিসেবে মাঠে লড়াই করা মনোজ মাঠের বাইরের এই রাজনৈতিক লড়াইয়ে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। রাজনীতির এই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর তিনি এখন পুরোপুরিভাবে ক্রিকেট এবং ব্যক্তিগত জীবনেই মনোনিবেশ করতে চান বলে মনে হচ্ছে।
তার এই বক্তব্য বাংলার রাজনীতিতে দুর্নীতিবিরোধী নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিল, যা আগামী দিনগুলোতে রাজনৈতিক মহলে বড় আলোচনার খোরাক হতে যাচ্ছে।
0 Comments