বিসিসিআই বনাম আইসিসি: ক্ষমতার অলিন্দে কার নিয়ন্ত্রণ?
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ময়দানে মাঠের লড়াই ছাপিয়ে অনেক সময় আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে ক্ষমতার লড়াই। সম্প্রতি দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞ অফ-স্পিনার সাইমন হারমারের করা কিছু মন্তব্য বিশ্ব ক্রিকেট মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তার অভিযোগের নিশানায় মূলত ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বা বিসিসিআই। হারমারের মতে, বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের বর্তমান আধিপত্যের মূল কারণ হলো তাদের অঢেল বাণিজ্যিক শক্তি, যা আইসিসিকেও কার্যত নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
কমার্শিয়াল পাওয়ারই কি সবকিছুর চাবিকাঠি?
দ্য গার্ডিয়ানের সাথে এক একান্ত আলাপচারিতায় ৩৭ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার স্পষ্ট করেই জানিয়েছেন যে, বাণিজ্যিক সক্ষমতাই বিসিসিআইকে আইসিসির ওপর কর্তৃত্ব ফলানোর সুযোগ করে দিয়েছে। হারমার বলেন, তাদের কাছে টাকা আছে, তাই তাদের হাতেই সব ক্ষমতা। এই পরিস্থিতি একজন খেলোয়াড় হিসেবে মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তার মতে, খেলোয়াড়দের কাজ কেবল মাঠের পারফরম্যান্সে মনোযোগ দেওয়া। হারমার মনে করেন, একমাত্র ট্রফি জয়ই এই ধারা বদলাতে পারে এবং মাঠের বাইরের হিসাব-নিকাশকে অপ্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারে।
পুরানো বিতর্কের নতুন বিস্ফোরণ
সাইমন হারমারের এই মন্তব্য নতুন কিছু নয়। এর আগেও পাকিস্তান ও ইংল্যান্ডের অনেক প্রাক্তন ক্রিকেটার বিভিন্ন সময়ে আইসিসি ইভেন্ট চলাকালীন ভারতের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বা আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির মতো বড় আসরগুলোতে ভারতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা নিয়ে অতীতেও অনেক বিতর্ক হয়েছে। গত বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সময় ভারতের ভেন্যু নির্ধারণ এবং অন্যান্য দেশের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ তুলে সরব হয়েছিলেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
দক্ষিণ আফ্রিকার ঐতিহাসিক সিরিজ জয় এবং হারমারের সাফল্য
মাঠের বাইরের রাজনীতির পাশাপাশি হারমার তার নিজের দেশের দলের সাফল্যের কথাও তুলে ধরেছেন। গত বছর ভারতের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জয়ের প্রসঙ্গটি ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তেম্বা বাভুমা নেতৃত্বাধীন দক্ষিণ আফ্রিকা দল যেভাবে ভারতকে হারিয়েছে, তা বিশ্ব ক্রিকেটে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। হারমার বলেন, আমাদের দল তারকা নির্ভর নয়, বরং সমষ্টিগত পারফরম্যান্সে বিশ্বাসী। ইডেন গার্ডেন্স এবং গুয়াহাটির সেই ঐতিহাসিক সিরিজ জয় ছিল প্রোটিয়াদের জন্য পঁচিশ বছরের অপেক্ষার অবসান।
- ইডেন গার্ডেন্সে ৩০ রানের রোমাঞ্চকর জয়।
- গুয়াহাটিতে ৪০৮ রানের বিশাল ব্যবধানে ভারতের পরাজয়।
- সাইমন হারমারের ১৭ উইকেট এবং সিরিজ সেরা হওয়ার কৃতিত্ব।
গুয়াহাটির সেই ম্যাচে ভারতের পরাজয় ছিল টেস্ট ক্রিকেটে তাদের ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য পারফরম্যান্স। সেখানে মাত্র ৮.৯৪ গড়ে ৪ ইনিংসে ১৭ উইকেট শিকার করে হারমার প্রমাণ করেছেন যে, মাঠের লড়াইয়ে দক্ষতা থাকলে বাইরের বিতর্ক ছাপিয়েও নায়ক হওয়া সম্ভব।
উপসংহার
ক্রিকেট বিশ্বের এই ক্ষমতার লড়াই থামার কোনো লক্ষণ নেই। বিসিসিআইয়ের বাণিজ্যিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, মাঠের লড়াইয়ে ভারতের জনপ্রিয়তা এবং ভক্তদের উন্মাদনাও অনস্বীকার্য। হারমারের মতো ক্রিকেটাররা যখন প্রশ্ন তোলেন, তখন তা আসলে আইসিসির স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষতা নিয়েই বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। তবে দিনশেষে ক্রিকেটপ্রেমীরা মাঠের লড়াইকেই সবার ওপরে স্থান দিতে চান, যেখানে জয়ী হবে যোগ্যতম দলই। আগামী দিনে আইসিসি এবং বিসিসিআইয়ের এই সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
0 Comments