আইপিএল ২০২৬: জসপ্রীত বুমরাহর ফর্মহীনতার নেপথ্যে কী?
বুমরাহর ছন্দপতন: আধুনিক ক্রিকেটের রহস্যময় বোলারের বর্তমান সংগ্রাম
আধুনিক ক্রিকেটের প্রেক্ষাপটে জসপ্রীত বুমরাহ কেবল একজন বোলার নন, বরং ব্যাটারদের জন্য এক সাক্ষাৎ আতঙ্ক। গত কয়েক বছরে ভারত যে দুটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয় করেছে, তার নেপথ্যে অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন বুমরাহ। তবে এবারের আইপিএল মৌসুমটি যেন তার ক্যারিয়ারের এক অদ্ভুত অধ্যায়। অন্তত ৩০ ওভার বোলিং করেছেন এমন বোলারদের তালিকায় বর্তমানে আইপিএলের সবচেয়ে খারাপ বোলিং গড়টি বুমরাহরই। একজন বিশ্বমানের বোলারের জন্য এটি সত্যিই বিস্ময়কর এবং হতাশাজনক পরিসংখ্যান।
উইকেটহীন পাঁচ ম্যাচ এবং দীর্ঘ অপেক্ষা
টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই বুমরাহর পারফরম্যান্স ছিল মলিন। কলকাতা নাইট রাইডার্স, দিল্লি ক্যাপিটালস, রাজস্থান রয়্যালস, রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স ব্যাঙ্গালুরু এবং পাঞ্জাব কিংসের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে টানা পাঁচটি ম্যাচে তিনি উইকেটশূন্য ছিলেন। অবশেষে ষষ্ঠ ম্যাচে গুজরাট টাইটানসের সাই সুদর্শনকে আউট করে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটান। তবে আট ম্যাচ খেলা শেষে তার নামের পাশে মাত্র দুটি উইকেট, যা তার নামের প্রতি সুবিচার করে না। এমনকি তার বোলিং গড় ১৩২.০০, যার অর্থ প্রতিটি উইকেটের জন্য তিনি গড়ে ১৩২ রান খরচ করেছেন।
তালিকায় বুমরাহর অবস্থান ও অন্যদের উত্থান
চলতি মৌসুমে যারা নিয়মিত বোলিং করছেন, তাদের মধ্যে বুমরাহ উইকেট শিকারের দৌড়ে সবার পেছনে। যেখানে ভুবনেশ্বর কুমার ১৫.৫২ গড়ে ১৭টি উইকেট নিয়ে তালিকার শীর্ষে, সেখানে বুমরাহর এই দৈন্যদশা সত্যিই উদ্বেগের। এছাড়া ঈশান মালিঙ্গা, প্রিন্স যাদব এবং জোফরা আর্চারের মতো বোলাররা ২০-এর নিচে গড়ে বল করছেন। অথচ গত মৌসুমে ইনজুরির কারণে কয়েকটি ম্যাচ মিস করেও ১২ ম্যাচে ১৮ উইকেট নিয়েছিলেন বুমরাহ, যেখানে তার ইকোনমি রেট ছিল দুর্দান্ত ৬.৬৮। এমনকি মার্চ মাসে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ফাইনালে ১৫ রানে ৪ উইকেট নিয়ে দলকে জিতিয়েছিলেন তিনিই।
ভয় কী আর আগের মতো আছে?
পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে ব্যাটারদের মানসিকতায়। আগে ট্র্যাভিস হেড বা সাঞ্জু স্যামসনের মতো ব্যাটাররা বুমরাহর বিপক্ষে চরম সতর্কতা অবলম্বন করতেন। কিন্তু এবারের আসরে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ১৫ বছর বয়সী বৈভব সূর্যবংশীর মতো তরুণ ব্যাটারও তার ওভারে দুটি ছক্কা হাঁকাচ্ছেন। সর্বশেষ সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদের ব্যাটাররা তার চার ওভারে ৫৪ রান তুলে নিয়েছেন। বুমরাহর সেই ‘ভয়ঙ্কর’ পরিচিতি যেন দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে।
ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতামত ও কারণসমূহ
বুমরাহর এই ফর্মহীনতার পেছনে বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন ভিন্ন কারণ দেখিয়েছেন:
- শারীরিক ক্লান্তি: সাবেক ভারত অধিনায়ক কৃষ্ণমাচারি শ্রীকান্ত মনে করেন, অত্যধিক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বুমরাহকে ক্লান্ত করে তুলেছে। এশিয়া কাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং ইংল্যান্ডের মাটিতে টেস্ট সিরিজের ধকল তার শরীরে প্রভাব ফেলেছে। ইংল্যান্ড সফরেই তিনি তিন ম্যাচে ১১৯ ওভার বল করেছেন।
- মানসিক চাপ: রবিচন্দ্রন অশ্বিনের মতে, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের টানা হার এবং লাগাতার সমালোচনা বুমরাহর বোলিং ছন্দে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
- ইনজুরির ইতিহাস: মোহাম্মদ কাইফের দাবি, বুমরাহর পুরনো পিঠের ইনজুরি তাকে পুরোপুরি স্বাভাবিকভাবে বল করতে বাধা দিচ্ছে।
অবশ্য মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের ব্যাটিং কোচ কাইরন পোলার্ড আশাবাদী। তিনি বিষয়টিকে কেবল একটি ‘সাময়িক খারাপ সময়’ হিসেবে দেখছেন এবং বিশ্বাস করেন বুমরাহ শীঘ্রই তার চেনা ছন্দে ফিরে আসবেন। বুমরাহ কি সত্যিই ফিরতে পারবেন, নাকি এটি তার ক্যারিয়ারের এক বড় টার্নিং পয়েন্ট হতে যাচ্ছে? উত্তর সময়ের হাতেই তোলা থাক।
