আইপিএলের মঞ্চে এক নতুন মুখ: রঘু শর্মা
২ মে, ২০২৬। আইপিএলের দ্বিতীয় এল ক্লাসিকো অর্থাৎ চেন্নাই সুপার কিংস ও মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের লড়াইয়ের সাক্ষী থাকল চিপক স্টেডিয়াম। সেই ম্যাচে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স তাদের একাদশে বড় চমক হিসেবে নিয়ে এল ৩৩ বছর বয়সী রঘু শর্মাকে। দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তার হাতে ক্যাপ তুলে দেওয়া হয় এবং ইমপ্যাক্ট সাব হিসেবে তাকে দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করা হয়। কিন্তু কে এই রঘু শর্মা? কেন তাকে নিয়ে এত আলোচনা?
অপ্রত্যাশিত শুরুর গল্প
রঘু শর্মা পাঞ্জাবের জলন্ধরের বাসিন্দা। একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া রঘু শুরুতে ক্রিকেটের চেয়ে পড়াশোনায় বেশি মনোযোগী ছিলেন। তবে ১৮ বছর বয়সের পর থেকে তিনি সম্পূর্ণ মনোযোগ ক্রিকেটের দিকে সরিয়ে নেন। ২০১৫ সালে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে তার আইপিএল যাত্রা শুরু হয়, তবে মূল দলে জায়গা পেতে তাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। শুরুতে তিনি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের নেট বোলার হিসেবে কাজ করতেন। তার দক্ষতা দেখে দল তাকে মূল স্কোয়াডে জায়গা দিতে বাধ্য হয়।
ওজন কমানোর অবিশ্বাস্য লড়াই
রঘুর এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। ক্যারিয়ারের শুরুতে তার ওজন ছিল ১০২ কেজি, যার কারণে অনেক কোচই তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না রঘু। তিনি কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন এবং মাত্র ছয় মাসের মধ্যে প্রায় ৩৫ কেজি ওজন কমিয়ে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিন ৪৬ ডিগ্রি গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দৌড়াতাম এবং বোলিং প্র্যাকটিস করতাম। আজকের রঘুকে দেখলে সেই সময়ের রঘুকে চেনা কঠিন।’
শেন ওয়ার্নের অনুপ্রেরণা
রঘু মূলত একজন ফাস্ট বোলার হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ইনজুরির কারণে তাকে বোলিং অ্যাকশন বদলাতে হয়। কিংবদন্তি শেন ওয়ার্নের বোলিং দেখে তিনি লেগ স্পিনে হাত পাকান। এই পরিবর্তনটিই তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। শেন ওয়ার্নের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করেই তিনি পাঞ্জাব রঞ্জি ট্রফি দলে জায়গা করে নেন।
পণ্ডিচেরি থেকে শ্রীলঙ্কা—অভিজ্ঞতার ঝুলি
পাঞ্জাব দলে অনিয়মিত হয়ে পড়ার পর তিনি পণ্ডিচেরিতে পাড়ি জমান। কিন্তু সেখানেও খুব বেশি সুযোগ না পেয়ে তিনি হতাশ ছিলেন। তবে ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কার গালে ক্রিকেট ক্লাবে খেলার সুযোগ পান তিনি। সেই সফর তার ক্যারিয়ারে বিশাল এক টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে ৬ ম্যাচে ৪৬টি উইকেট শিকার করে তিনি বিশ্ব ক্রিকেটের নজরে আসেন। তার এই অসাধারণ পারফরম্যান্স তাকে পুনরায় ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরিয়ে আনে।
ওয়াসিম জাফর ও হরভজন সিংয়ের অবদান
শ্রীলঙ্কা থেকে ফেরার পর রঘু আবার পাঞ্জাবের হয়ে মাঠে নামেন। সেখানে তার বোলিং কৌশল নজর কাড়ে ওয়াসিম জাফর এবং হরভজন সিংয়ের। তারা দুজনেই মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স টিম ম্যানেজমেন্টের কাছে রঘুর নাম সুপারিশ করেন। সেই থেকে শুরু মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে তার নতুন সফর। নেট বোলার থেকে আইপিএল অভিষেক—রঘুর এই যাত্রা প্রমাণ করে যে বয়স কেবল একটি সংখ্যা মাত্র, যদি ইচ্ছাশক্তি অটুট থাকে।
উপসংহার
রঘু শর্মার গল্প কেবল একজন ক্রিকেটারের গল্প নয়, এটি ধৈর্যের গল্প। পেশাদার প্রকৌশলী বা চিকিৎসকের পরিবার থেকে উঠে এসে আইপিএলের মতো মঞ্চে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা সহজ ছিল না। চেন্নাইয়ের চিপক স্টেডিয়ামে তার অভিষেক মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের জন্য এক নতুন আশা নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, আইপিএলের এই বড় মঞ্চে নিজেকে কতটা প্রমাণ করতে পারেন ৩৩ বছর বয়সী এই লেগ-স্পিনার।
0 Comments